বিশিষ্টজনের আহ্বান
দেশের স্বার্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘাত বন্ধ করতে হবে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গত কয়েকদিনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া ও হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা শঙ্কায় রয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। আওয়ামী লীগের সময়ে ছাত্রলীগ ছিল বেপরোয়া। একচেটিয়া সাড়ে পনেরো বছর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে রাখে। বিরোধী দল বিএনপি বা জামায়তের ছাত্র সংগঠনগুলো তখন ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সবার প্রত্যাশা ছিল এবার হয়তো পুরোনো ধারার ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হবে। কিন্তু না। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় রাজপথে লড়াই করা দল বা তাদের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে নতুন করে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, এটিকে নিজেদের ‘পায়ে কুড়াল’ মারার মতো ঘটনা হিসাবে দেখছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করেন, সম্প্রতি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে যে সংঘর্ষ ও হানাহানির ঘটনা ঘটেছে, তাতে আওয়ামীবিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট হলে এর সুযোগ নেবে ফ্যাসিস্টরা।
৪ আগস্ট রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ এবং সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে দ্বিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অনেক শিক্ষার্থী, এমনকি আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষও আহত হন। সংঘর্ষের সময় লাঠি, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে-এমন ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সেখানেও হামলার ঘটনা ঘটে।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অতীতে শিক্ষাঙ্গনে যে ভয়ভীতি, সন্ত্রাস ও দখলদারির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে। এর জন্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ছাত্রসংগঠন-সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনা কেবল শিক্ষার পরিবেশই নষ্ট করছে না, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভীতির সংস্কৃতিও তৈরি করছে। মত, পথ ও আদর্শের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয় হলেও সেই ভিন্নতা কখনোই সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া কিংবা রক্তপাতের কারণ হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সব পক্ষকে সংযম, সংলাপ ও সহাবস্থানের পথে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট ডেকে আনতে পারে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, দেশ যখন শহীদদের স্মরণ করছে, তখন জুলাই পক্ষদ্বয়ের মধ্যে স্বার্থ ঢুকে গেলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ ও সহিংসতা দ্রুত বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে দেশের স্বার্থবিরোধী অপতৎপরতার ঝুঁকিও বাড়বে। জুলাই জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার স্বার্থে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা, সংলাপ ও সহাবস্থান জরুরি। ৫ আগস্টের পর দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ ধরনের সংঘাত দেখতে চায় না। ছাত্র সংগঠনগুলোকেই দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সেজন্য সরকারপ্রধান তারেক রহমান ও বিরোধী দলের প্রধান ডা. শফিকুর রহমানের মধ্যে সমঝোতা সংলাপ করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
জাতীয় অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ যুগান্তরকে বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা বেশি দরকার। একসময় সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু এখন তাদের মধ্যেই যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে, এর পেছনে ক্ষমতার ব্যবহার ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতার দাপট দিয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং একে অপরকে যথাযথ মূল্যায়ন করার মানসিকতা। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঝগড়াবিবাদ, সংঘর্ষ বা মারামারির মাধ্যমে কখনোই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ও হামলার ঘটনাগুলো গুরত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

