Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদায়ন

বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

Advertisement

সাইফ আহমাদ

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

Advertisement

উড়োজাহাজের কারিগরি ত্রুটি সারাতে প্রকৌশলীদের অসহযোগিতা, নিজস্ব এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি পাশ ছাড়াই ডিউটি, ব্যাগেজ চুরি, কনটেইনার নিয়ে নয়ছয়-বিমানের পিছু ছাড়ছে না এসব অভিযোগ। এর সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ। আছে স্বজনপ্রীতি ও অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ইস্যু। সব মিলিয়ে চরম অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় চলছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিদেশি স্টেশনগুলো। গুরুতর এসব অভিযোগের পরও থামছে না ওসব স্টেশনে অযোগ্যদের দাপট।

রোমে কারিগরি ত্রুটির কারণে যাত্রীসহ ৪০ ঘণ্টারও বেশি উড়োজাহাজ আটকে থাকলেও বিমানের স্টেশন ম্যানেজার বিষয়টি জানতেনই না। কুয়েতে স্টেশন ম্যানেজারের বিরুদ্ধে উঠেছে ব্যাগেজ চুরির অভিযোগ। ব্যাংককে যাত্রী হয়রানি এবং সিঙ্গাপুরেও উড়োজাহাজ আটকে থাকার ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। মদিনায় স্টেশন ম্যানেজারের কাছ থেকে ঢাকায় কনটেইনার নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি নিয়ে সৃষ্টি হয় চরম ভোগান্তি।

যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে বিমানের বিদেশি স্টেশনগুলোর অনিয়ম, গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে বিমানের যাত্রীসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংস্থাটির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বিদেশি স্টেশনগুলোয় দক্ষতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে এর প্রভাব পড়ে যাত্রীসেবা ও ফ্লাইট পরিচালনায়। আন্তর্জাতিক স্টেশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট আইন, নিরাপত্তাবিধি ও অপারেশন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা জরুরি। তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা গাফিলতির অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিমানের সেবার মান ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি-দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত যুগান্তরকে বলেন, বিদেশি স্টেশনগুলো নিয়ে এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম, গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।

সূত্রমতে, মদিনা স্টেশন ম্যানেজার মিজানুর রহমানের গাফিলতিতে জমজমের পানি নিয়ে ওমরাহ যাত্রীদের অসন্তোষের সূত্রপাত। বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে ১৮টি কনটেইনারের মধ্যে ১৭টি সময়মতো অফলোড হলেও জমজমের পানি থাকা ১৮ নম্বর কনটেইনারটি পড়ে থাকে। ঢাকায় ব্যাগেজ কন্ট্রোলকে কনটেইনারটির তথ্যও যথাযথভাবে জানানো হয়নি। ফলে ব্যাগেজ বেল্টে জমজমের পানি পৌঁছাতে তৈরি হয় চরম ভোগান্তি। এ ঘটনায় বরখাস্ত করা হয় বিমানের দুই কর্মকর্তাকে। বিমানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার জেরে গ্রেফতার হন মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান। বিমানের সূত্র বলছে, গুরুত্বপূর্ণ মদিনা স্টেশনের দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। এর আগে তার এ ধরনের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও নেই। এমন কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতির খেসারত দিতে হয় ওমরাহ যাত্রীদের।

রোমে পাশ ছাড়াই স্টেশন পরিচালনা : যুগান্তরের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, গত আগস্টে রোমের ফিওমিচিনো বিমানবন্দরে বিমানের বোয়িং উড়োজাহাজের ফ্লাইট বিজি-৩০৬ কারিগরি ত্রুটিতে অচল হয়ে পড়ে। জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা থেকে উদ্ধার সরঞ্জামসহ রোমে পাঠানো হয় প্রকৌশল বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ ও ইশাক বাবুকে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের অভিযোগ, রোমে পৌঁছেই তারা স্টেশন ব্যবস্থাপনার চরম সমন্বয়হীনতার মুখে পড়েন। তাদের অভিযোগ, রোমের কান্ট্রি ম্যানেজার ও স্টেশন ম্যানেজার দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ‘এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি পাশ’ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে উদ্ধারকারী দলের জন্য বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা করতে পারেননি তারা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টার্মিনালে অপেক্ষা করতে হয় প্রকৌশলীদের। তাদের দেওয়া দাপ্তরিক চিঠি অনুযায়ী, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই উড়োজাহাজটি উড্ডয়নযোগ্য করেন তারা। কিন্তু ফ্লাইটটি রোম ছাড়ার পর স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের ফেলে চলে যান। গভীর রাতে পাসপোর্ট, লাগেজসহ বিদেশি বিমানবন্দরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকতে হয় প্রকৌশলীদের। পরে নিজেদের খরচে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে পৌঁছান তারা। রোম স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল হোসাইনের বিরুদ্ধেও অসহযোগিতার অভিযোগ আনেন প্রকৌশলীরা।

সিঙ্গাপুর স্টেশনে বিমানে কারিগরি ত্রুটি : ৩১ আগস্ট সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে বিমানের বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটেও বড় ধরনের কারিগরি জটিলতা দেখা দেয়। ১৫১ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়নের প্রস্তুতির সময় ককপিটের আর-৪ উইন্ডোতে ফাটল ধরা পড়ে। এরপর প্রয়োজনীয় পার্টস সরবরাহে স্টেশন ও সাপ্লাই চেইনের সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পায়। বিকল্প এয়ারলাইন্সে উইন্ডো পাঠানোর উদ্যোগ এয়ারওয়ে বিল ও চাঙ্গি বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের জটিলতায় সার্ভিস ব্যর্থ হয়। এতে যাত্রীদের দীর্ঘ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পরে ঢাকা থেকে শিডিউল ফ্লাইটে পার্টস ও অতিরিক্ত প্রকৌশলী পাঠানো হয়।

কুয়েত স্টেশনে স্বামী-স্ত্রী : বিমানের কুয়েত স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন বিমানের কর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে ব্যাগেজসংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চলমান অবস্থায় একই স্টেশনে তার স্ত্রী শামীমা পারভীনকে পদায়ন করা হয়। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি কুয়েত থেকে বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে ১৯৩ যাত্রী ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে অবতরণের পর নিরাপত্তা বিভাগের ঝটিকা অভিযানে ১৪ যাত্রীর লাগেজ পরীক্ষা করে ১২ জনের লাগেজে নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ওজন পাওয়া যায়। অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া সরকারের খাতায় এর হিসাব নেই। অনেক যাত্রীকে রসিদও দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহজাহানের বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই একই স্টেশনে তার স্ত্রী শামীমা পারভীনকে পদায়ন করা হয়। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শামীমা পারভীন এর আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

ব্যাংককে অসহযোগিতা : ১ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংকক বিমানবন্দরে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানের একটি উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় গ্রাউন্ডেড থাকে। ঢাকা থেকে বিশেষ প্রকৌশলী দল পৌঁছালেও বিমানবন্দরে স্টেশন ম্যানেজারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকৌশলীদের পারমিশন ও টুলস হ্যান্ডলিং নিয়ে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

এদিকে একের পর এক বিপর্যয়ের পর বিদেশি স্টেশন ব্যবস্থাপনায় ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কড়াকড়ি আরোপ করেছে বিমান। করপোরেট পলিসি ম্যানুয়েল ও জব ডেসক্রিপশন ম্যানুয়েল অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য নিশ্চিত করতে জরুরি প্রশাসনিক আদেশ জারি করে বিমান কর্তৃপক্ষ। আদেশে নতুন পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা লিখিতভাবে নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া বিদেশি স্টেশনে পদায়নের ক্ষেত্রেও আরোপ করা হয়েছে নতুন শর্ত। সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জানা যায়, ৩০ সেপ্টেম্বর বিদেশি স্টেশনে বদলি-পদায়ন নিয়ে আরও একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। নতুন নিয়মে পুনর্গঠিত বৈদেশিক স্টেশনে বদলি পর্ষদের সভাপতি করা হয়েছে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইওকে। সদস্য হিসাবে থাকবেন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডিসিইও, সব পরিচালক এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ)। নির্দিষ্ট বিভাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিচালক মনোনীত বিভাগীয় প্রধানকেও সদস্য করার বিধান রাখা হয়েছে। বিদেশি স্টেশনে কর্মকর্তা পদায়নে যোগ্যতা, টেকনিক্যাল দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই নতুন কাঠামো করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এক কর্মকর্তা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্ব রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ

রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ

বিওবিসির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দাপুটে কিশোর গ্যাং

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দাপুটে কিশোর গ্যাং

যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদায়ন বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম