Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্ব

রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ

Advertisement

Icon

শহীদুল ইসলাম ও নূরে আলম জিকু

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সাম্প্রতিক মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্বে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার হুমকির মধ্যে যেখানে দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা, সেখানে বিরোধ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। কারণ, জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বে একের পর এক লংমার্চ কর্মসূচি পালন অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে দলগুলোর নেতাদের পালটাপালটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই উত্তাপ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হলে পরাজিত শক্তি তার সুযোগ নিতে পারে। তারা কেউ কেউ সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপেরও পরামর্শ দিয়েছেন।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, অশুভ আঁতাতকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলকে অবশ্যই আরও সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধের সময়ও যেমন কৌশলগত সংলাপ চলে, সরকারকে ঠিক তেমনই বিরোধী দলের সঙ্গে সংসদীয় রীতিতে সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়েই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো দ্বন্দ্বে জড়ালে দেশের সবার ক্ষতি। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে অতীতে যে অন্যায়, অবিচার, অপকর্ম হয়েছে; সেগুলো অব্যাহত থাকলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি ব্যর্থ হলে জামায়াত বা আওয়ামী লীগ আসতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগের আসার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। তাই আমি বলব, সরকার ও বিরোধী দল নিজেদের মধ্যে সংলাপে বসে বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করুক। তা না হলে পরিণতি হলো অরাজকতা এবং এর মাশুল দেবে বাংলাদেশের জনগণ। আমাদের রাজনীতিকদের দূরদর্শিতা, তাদের অপরিপক্বতা ও সীমাবদ্ধতার জন্যই আমরা অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘সমঝোতার’ গুঞ্জনে দল দুটির মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে জামায়াত নেতারা ভিন্নকথা বলছেন। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ঢাকতে গিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে সখ্য রাখার অপপ্রচার চালাচ্ছে বিএনপি।

বৃহস্পতিবার ফেনীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের অনুসারী ও একটি ‘গুপ্ত বাহিনী’ জনগণের কল্যাণে সরকারের কর্মসূচিগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে আবারও হাত মিলিয়েছে। দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ‘গুপ্ত রাজনীতি’ ও ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার সরকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এর সঙ্গে জড়িত, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের কোনো কর্মসূচি নেই; বরং তারা কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতেই লিপ্ত।

সূত্রমতে, নির্বাচনের মাত্র সাত মাস যেতে-না-যেতেই জামায়াত ও এনসিপির লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও বিএনপি ক্ষুব্ধ। তাছাড়া সরকারের মেয়াদের এত অল্প সময়ের মধ্যে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা আছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন-এত কম সময়ের মধ্যে লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তারা আর কী ধরনের কর্মসূচি পালন করবে? তাছাড়া অব্যাহত কর্মসূচির কারণে নতুন করে দেশ অচল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দেশে অরাজকতাই চাচ্ছে। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী প্রত্যাশা ছিল, সরকার ও বিরোধী দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতে সে ধরনের বেশকিছু ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব এখন সুস্পষ্ট। যদিও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সদ্ভাব বজায় রেখে চলার কথা বলছে বিএনপি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে নতুন করে কোনো পারস্পরিক বৈঠকের বা আলাপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবে বিএনপির একটি বড় অংশের মতে, সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনাই বর্তমান সরকারের জন্য টেকসই সুফল বয়ে আনবে।

ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী বলেন, একটি কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সমাজে সংসদেই বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা করার কথা। সরকারের বয়স মাত্র ৬-৭ মাস হওয়ার পরেই রাজপথে নামার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সব ধরনের বিরোধ ও মতপার্থক্য জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেটি না করে জামায়াত অন্য পথে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গুপ্ত বলতে আমরা যাদের বুঝি, তারা যদি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শক্তির সঙ্গে ঐক্য করে, তাহলে দুটোই ডুববে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের কখনোই মেনে নেবে না। জনগণ দূর ভবিষ্যতেও এ দেশে স্বৈরাচারী শক্তি বা হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান দেখতে চায় না। এই ধরনের অশুভ আঁতাত সফল হবে না।

জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা প্রশ্নে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব কিংবা সমঝোতার প্রশ্ন তো তখন আসে, যখন তার আসল চরিত্রটা বোঝা যায়। জামায়াতের আসল চরিত্র বোঝা মুশকিল। অতীতে তারা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের বন্ধু হয়েও আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ১৯৮৬ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিকে না জানিয়ে হঠাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে যায়। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে হটাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমান্তরালভাবে রাজপথে আন্দোলন করে। ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘদিন বিএনপির পাশে থেকে ২০০১ সালে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়। অথচ এক-এগারোর পর আবার বিএনপির দায় নিতে অস্বীকার করে। আলাল বলেন, ঘন ঘন দিক পরিবর্তনকারী দলকে বোঝা কঠিন বিধায় তাদের সঙ্গে সমঝোতা বা দ্বন্দ্ব-উভয় ক্ষেত্রেই গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। জামায়াত যদি সঠিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন না করে এবং এভাবে দিক বদলাতে থাকে, তবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না।

জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু যুগান্তরকে বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময় বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একত্রে আন্দোলন করেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অনেক জায়গায় জামায়াত ও আওয়ামী লীগ একত্রিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছে। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও অর্জিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য জামায়াতের সচেতন থাকা উচিত। জামায়াতে ইসলামী যেন কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে হাত না মেলায়। কারণ ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সমঝোতা করলে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা বিপন্ন হবে এবং ফ্যাসিস্টরাই এতে লাভবান হবে।

এদিকে জামায়াতের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে দলটির মতদ্বৈধতা রয়েছে। এছাড়া সরকারকে চাপে ফেলে তারা আরও কিছু দাবি আদায় করতে চায়। পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতার চিত্র জনমনে তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পথও তৈরি করার কৌশল নিয়েছে দলটি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি তাদের ভারতপ্রীতি, দিল্লিপ্রীতি ঢাকতে গিয়ে অসত্য কথা বলছে। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার আওয়ামী লীগ সারা দেশে একদিনে মিছিল করার সুযোগ পায় কী করে? প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকায় নিষিদ্ধ দল মিছিল করার দুঃসাহস কীভাবে পায়? মানুষ কি বোঝে না? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কি খবর নেই? তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্য ধরে রাখতে চাইলে সরকার যদি কোনো উদ্যোগ নেয় জামায়াত সহযোগিতা করবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে তারা সেটা করবে কিনা সে সন্দেহ তো রয়েই যায়।

এনসিপি যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগকে বিএনপিই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। আমরা বলেছি, সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে, চাঁদাবাজি, দখলদারি বন্ধ করতে হবে। তাহলে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব। কিন্তু সরকার সেটা না করে বিরোধী দলের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্ব রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ

রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ

বিওবিসির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দাপুটে কিশোর গ্যাং

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দাপুটে কিশোর গ্যাং

যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদায়ন বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

বিমানের বিদেশি স্টেশনেও নৈরাজ্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম