রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দাপুটে কিশোর গ্যাং
Advertisement
আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা, কুমিল্লা ব্যুরো ও আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে খোলস পালটে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংগুলো। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা ও খুলনায় খুন, ছিনতাই, মাদক ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধের বড় অংশই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। আগে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় থাকা এসব গ্যাংয়ের অনেকেই এখন বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কথিত ‘বড়ভাই’র ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকজন গ্যাং সদস্য গ্রেফতার হলেও মূল গডফাদাররা এখনো অধরা। পুলিশ বলছে, ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনায় পাড়া মহল্লায় বাড়ছে অপরাধ
‘বড়ভাই’দের আশীর্বাদে ভয়ংকর
গত ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কেনাকাটা শেষে রিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন দুই নারী। নগরীর আহসান আহমেদ রোডে আসার পর হঠাৎ তাদের গায়ে কেউ একজন ডিম ছুড়ে মারে। এসময় কয়েকজন পথশিশু এগিয়ে এসে তাদের হাতে থাকা ব্যাগ টার্গেট করে মোছামুছি শুরু করে। এক ফাঁকে ব্যাগ খুলে টাকা হাতিয়ে নেয়। টের পেয়ে টাকাসহ ১২-১৩ বছর বয়সি একটি মেয়েকে ধরে ফেলে তারা। ওর সঙ্গে থাকা ৮-১৪ বছর বয়সি আরও কিছু ছেলেমেয়েকে এ সময় সক্রিয় দেখা যায়। এর আগে ১৯ আগস্ট লবণচরায় আধিপত্য নিয়ে দুই তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সি কিশোর-তরুণদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। চুরি, ছিনতাই, মাদক কেনাবেচা নিয়ে আধিপত্যের জেরে ওই খুনের ঘটনা ঘটে। খুলনায় স্কুল ঝরে পড়া এবং নিুআয়ের পরিবারের কিশোরদের নিয়েই পাড়া মহল্লায় গড়ে উঠছে ছোট ছোট অপরাধী চক্র। এদের সংখ্যা অসংখ্য। এদের মধ্যে অনেকে সিনিয়র গ্রুপের সঙ্গেও মিসে যাচ্ছে। খুলনায় এরাই মূলত যুক্ত হচ্ছে খুন ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে। হয়ে উঠছে একেকটি দানব।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, খুলনা মহানগরীতে টিপসি বয়েজ, ডেঞ্জার বয়েজ, গোল্ডেন বয়েজ, কিং অব রূপসা ও টাইগার টিম নামের উল্লেখযোগ্য অন্তত ৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। সম্প্রতি লবণচরার রাজিন হত্যার পর গ্রেফতার ৪ কিশোরের মধ্যে কয়েকজন ডেঞ্জার ও গোল্ডেন বয়েজের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। অপেক্ষাকৃত সিনিয়র কিশোরদের নিয়ে গ্রুপটি ডেঞ্জার বয়েজ নামে পরিচিত। মাদক সেবন-বিক্রি ও ছিঁচকে অপরাধে জড়িতদের একটি অংশ টিপসি বয়েজ নামে পরিচিত। এদের অনেকেই বস্তি এলাকার। অন্যদিকে স্কুল পড়ুয়া কিশোরদের একটি গ্রুপ গোল্ডেন বয়েজ নামে পরিচিত। ডেঞ্জার ও গোল্ডেন বয়েজের কার্যক্রম বৈকালী বাজারকেন্দি ক এবং টিপসি গ্রুপের তৎপরতা বয়রা পালপাড়া এলাকায়। কয়েক মাস আগে সোনাডাঙ্গার গল্লামারী এলাকায় সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির অভিযোগে সাহেল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা ছাড়াও চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সোনাডাঙ্গা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে গ্রেফতারের সময় চাইনিজ কুড়াল, ধাতব পাঞ্চসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ।
সম্প্রতি খুলনায় টাইগার টিম নামের একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রকাশ্যে চলে তাদের মোটরবাইক শোডাউন ও অস্ত্রের মহড়া। খুলনার কুখ্যাত গ্যাং ‘বি কোম্পানি’র মতো চলে তাদের সামাজিক কার্যক্রম। বাহিনীর নামে ব্যানার টানিয়ে চলে প্রচারণার কাজও। গ্রুপটির মূলহোতা কুখ্যাত সন্ত্রাসী জ্যামি। তিনি বয়রা রায়েরমহল বড় মসজিদ এলাকার বাসিন্দা। বেশ কয়েক বছর আগে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে। একটি গুলি তার পায়ে বিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সে দেশ ত্যাগ করে। বিদেশে বসেই সে এখন নিয়ন্ত্রণ করে তার বাহিনী।
সূত্র জানিয়েছে, দৌলতপুর মহেশ্বরপাশা এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও চরমপন্থি নেতা হুমায়ুন কবির হুমা তার সন্ত্রাসী কার্যকলাপের একান্ত সহযোগী। জ্যামির হুকুমেই চলে হুমাসহ খুলনার চার থানার সব সন্ত্রাসী কার্যক্রম। এই টাইগার টিমের বিরুদ্ধে জাহিদ মার্ডার, বয়রা রায়ের মহলের রাজা মার্ডার, আলোচিত যুবদল নেতা মাহবুব হত্যা, ঘের ব্যবসায়ী আল আমিন হত্যা, শুভ হত্যা, আলোচিত যুবদল নেতা রাসু হত্যা, দীলিপ মাস্টার হত্যা, আফিলগেটের সোহেল হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে খুলনার বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে পুলিশের তদন্তেও উঠে এসেছে ১৬-৩০ বছর বয়সি তরুণদের একাধিক অপরাধী গ্রুপের কথা। এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র, চাঁদাবাজি, দখল, জমি-ঘের-ঘাট, পরিবহণ ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
রূপসা এলাকায় কিং অব রূপসা নামে একটি কিশোর গ্যাং আলোচিত। এসব গ্রুপের সদস্যরা কখনো নিজেদের আধিপত্য দেখাতে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে, কখনো মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেয়। আবার ছোটখাটো বিরোধ থেকেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। এই গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে শাহীন, নাসির ও অপু নামে তিন কিশোর। কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা মধ্যে। টিপসি বয়েজের সদস্যদের একটি অংশ মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আর এই কাজে সহযোগিতা করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর লোকজন। র্যাব-৬-এর সাম্প্রতিক অভিযানে ‘আরমান বাহিনী’র প্রধান শুটার আরমানকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯-২০ বছর বয়সি এই তরুণের দলে রয়েছে ৮-১০ জন সদস্য। এরা সবাই খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতৃত্বে চলে।
কেএমপির গোয়েন্দা বিভাগ জানায়, খুলনার অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণ করে ৯টি বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, ট্যাংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ। এই সিনিয়র গ্রুপ মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিশোর গ্রুপকে নিজেদের কাজে লাগায়। এরাই মূলত কিশোর গ্যাংয়ের হাতে তুলে দিচ্ছে অস্ত্র।
খুলনা নাগরিক সংগঠনের নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সরকার পতনের পর নগরীতে নাশকতা, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ করে কিছু অপরাধীগ্রুপ সক্রিয় হয়েছে। বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্রুপের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় তাদের নাম না থাকাটা উদ্বেগের বিষয়।
তবে কেএমপি কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘টাইগার টিম’ নামে কোনো বাহিনীর তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে একাধিক বাহিনী গড়ে উঠেছে নগরীজুড়ে। বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে তদন্ত করে দেখার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং দমনে শুধু অভিযানই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জরুরি। তবে পুলিশ কোনো অপরাধীকে ছাড় দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
কুমিল্লায় ছায়াবদল দৌরাত্ম্য অটুট
খুন, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ নগরীর অপরাধ জগতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা কুমিল্লার শীর্ষ কিশোর গ্যাংগুলোর মাথার ওপরের ছায়া বদলেছে; কিন্তু এতটুকু বদলায়নি তাদের দাপট। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ‘অভিভাবকরা’ তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। আগে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘রাও’ ও ‘ক্রাইম সেটআপ’সহ কিছু গ্যাং এখন মহানগর ছাত্রদলের একাধিক নেতার ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শুক্রবার রাতে কক্সবাজার থেকে গ্যাং দুটির দুই প্রধানসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কয়েকজন ‘অভিভাবকের নাম’ বেরিয়ে এলেও পুলিশ তাদের নাম প্রকাশ করেনি। তবে পুলিশ বলছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের জন্য কুমিল্লা নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোকে কিছু ছাত্রদল নেতা শেল্টার দিচ্ছেন। এ সুযোগে ‘রাও’ ও ‘ক্রাইম সেটআপ’সহ বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নগরীর পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে গড়ে ওঠা ৫০টির বেশি গ্যাং বর্তমানে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব গ্যাংয়ের অভিভাবক বা বড় ভাইদের সবাই চিনলেও কেউ প্রকাশ্যে তাদের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সম্প্রতি মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের সঙ্গে মিছিলে রাও গ্যাংপ্রধান ইমরান হোসেন রতন ও তার সহযোগীদের দেখা যায়। এতে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলে সংবাদ সম্মেলন করে গ্যাংলিডার রতনকে চেনেন না বলে দাবি করেন ছাত্রদল নেতা মহসিন। কিন্তু এর দুদিন পরই রতনের সঙ্গে মহসিনের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়, যেখানে তাদের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ মেলে। যদিও মো. মহসিন বলেন, আমি কোনো গ্যাং গ্রুপকে শেল্টার দিই না। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদুজ্জামান রানা জানান, কিশোর গ্যাংকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, ‘রাও’ গ্যাংয়ের প্রধান ইমরান হোসেন রতন হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রসহ ৯টি মামলার আসামি। গ্যাংটিতে কমপক্ষে দুই শতাধিক সদস্য এবং নগরীতে ৭-৮টি উপশাখা রয়েছে। অন্যদিকে ‘ক্রাইম সেটআপ’ গ্যাংটিও সমানভাবে ভয়ংকর। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যা করে এই গ্যাংয়ের সদস্যরা। স্থানীয়রা জানান, গ্যাংটি নগরীর সালমানপুর, চাঙ্গিনী ও কোটবাড়ী এলাকার একাধিক রাজনৈতিক নেতার শেল্টারে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কক্সবাজারে ডিবির অভিযানে গ্রেফতার ৪ : শুক্রবার গভীর রাতে কক্সবাজারে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই ‘রাও’ ও ‘ক্রাইম সেটআপ’র দুই প্রধানসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এরা হলো-রাও’র প্রধান ইমরান হোসেন রতন ও তার সহযোগী সাইফুল ইসলাম। সাইফুলের বিরুদ্ধেও ১০টি মামলা রয়েছে। এছাড়া ক্রাইম সেটআপের প্রধান মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ ও সহযোগী রবিউল ইসলাম নবী ওরফে কিং মেকার। তাদের বিরুদ্ধেও ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কয়েকজন ‘অভিভাবকের নাম’ বেরিয়ে এসেছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে পুলিশ তা প্রকাশ করেনি।
এছাড়া শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে আরও ৩৬৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ নিয়ে পাঁচ দফায় ২ হাজার ৩৫ জনকে আটক করা হলো।
গডফাদারদের খুঁজছে পুলিশ : কুমিল্লা ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ বলেন, গ্রেফতার হওয়া চারজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত আমরা খতিয়ে দেখছি। নেপথ্যের গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রাজনৈতিক কোনো ব্যক্তি এর সঙ্গে জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফেরাতে ১০ দিন ধরে জেলাজুড়ে ডিবি ও পুলিশের যৌথ চিরুনি অভিযান চলছে। প্রায় দুই হাজার সন্দেহভাজন কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধের প্রমাণ পাওয়ায় অনেকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। বাকিদের সতর্ক করে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং কালচার সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কুমিল্লা নাগরিক অধিকার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা এমরান বলেন, রাও ও ক্রাইম সেটআপ আগে ছাত্রলীগের শেল্টারে ছিল। সম্প্রতি ছাত্রদল নেতার সঙ্গে একজনের ছবি দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি। ভয়ংকর এ দুটি গ্যাংকে যে কোনো মূল্যে দমন করতে হবে।
চট্টগ্রামে ফের বেপরোয়া
তালিকা করেও নিয়ন্ত্রণে হিমশিম সিএমপি
চট্টগ্রামে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’। প্রতিদিনই নগরীর কোথাও না কোথাও ঘটছে নানা অঘটন। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা তৎপরতার পরও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। পুলিশ ও স্থানীয়দের অভিযোগ, কথিত ‘বড় ভাইদের’ শেল্টারেই কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং-এর হাতে ৩৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা ছয়শর বেশি। পুলিশের খাতার বাইরেও রয়েছে অসংখ্য ঘটনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের শেল্টারে যারা অপকর্ম করত, তাদের অনেকে এখন ভোল পালটেছে। বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের কথিত বড় ভাইদের সঙ্গে তাদের চলাফেরা দেখা যাচ্ছে। তবে অপকর্মের ধরন বদলায়নি। স্থানীয়রা জানান, নগরীর ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর মোস্তফা টিনুর অনুসারী হিসাবে নয়ন, কামরুলসহ অনেকে কিশোর গ্যাং-এ জড়িত ছিল। এখন তাদের যুবদল নেতা ইমদাদুল হক বাদশার অনুসারীদের মিছিল-মিটিংয়ে দেখা যায়। বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোড এলাকায় মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোলাগুলির ঘটনায় ১৬ মামলার আসামি মো. মুরাদকে গ্রেফতার করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর অনুসারী ও কিশোর গ্যাং লিডার হিসাবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। এখন মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হকের সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে তাকে দেখা যায়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এমদাদুল হকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) হাতে কিশোর গ্যাং লিডারদের একটি তালিকা রয়েছে। তবে তালিকাভুক্তদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নগরীর অন্তত অর্ধশতাধিক এলাকায় কিশোর গ্যাং-এর দৌরাত্ম্য রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনায় ১৫টি গ্যাং-এর নাম বেশি এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে খুলশির ৫জি ও ৭জি, চকবাজারের ৭ বয়েজ ও কিউট বয়েজ, মুরাদপুরের এমবিএস, পাঁচলাইশের কেবি, এনএস, ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিসু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সন্ধ্যার পর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, সিআরবি, খুলশি, ফয়েস লেক, ডেবারপার, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বিভিন্ন এলাকায় মাদক বেচাকেনা, ছিনতাই, আড্ডাসহ নানা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে মরিয়া কিশোর গ্যাং। মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ছিনতাইয়ের অনেক ঘটনায়ও কিশোর অপরাধীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি সিএমপির ‘অপারেশন এস ড্রাইভ’ শুরু হওয়ার পর কয়েক মাসে কিশোর গ্যাং-এর কয়েকশ সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। অস্ত্র, ইয়াবাসহও ধরা পড়ছে কিশোর-যুবকরা।
৪ এপ্রিল বাকলিয়ার মিয়াখান নগরে দুই কিশোর গ্যাং-এর গোলাগুলিতে ১৩ বছরের শিশু ফাহিম দুই পায়ে গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজন আহত হয়। পুলিশ চারজনকে গ্রেফতার করে। ৬ এপ্রিল কোতোয়ালির কারাবানীগঞ্জ বলুয়াদিঘির পাড়ে যুবদল কর্মী মিনহাজকে কুপিয়ে কবজি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায়ও কিশোর গ্যাং-এর সদস্যরা জড়িত বলে পুলিশ জানায়। ১২ এপ্রিল চকবাজারের মৌসুমী আবাসিক এলাকায় দুপক্ষের সংঘর্ষে বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আশফাক কবির সাজিদ নিহত হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে খুলশির ওয়্যারলেস গেট এলাকায় ছুরিকাঘাতে হৃদয় নামে এক কিশোর নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় ছয় কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সিএমপির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশীদ বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রতিদিনই সদস্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। প্রতিটি থানায় গ্রেফতারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, সে বিষয়ে খোঁজখবর রাখা উচিত।
