Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

রূপালী ব্যাংকে ৯৯৩ কোটি টাকা খেলাপি

ঋণ আদায়ে বেক্সিমকোর সম্পত্তি নিলামে

মনির হোসেন

মনির হোসেন

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণ আদায়ে বেক্সিমকোর সম্পত্তি নিলামে

Advertisement

খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার বেক্সিমকো লিমিটেডের বন্ধক রাখা জমি নিলামে তুলেছে রূপালী ব্যাংক। ৯৯৩ কোটি টাকা আদায়ে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ২৬ একর জমি ও সম্পত্তি নিলামে ডাকা হয়েছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে শুক্রবার এই নিলাম বিজ্ঞপ্তির কথা জানানো হয়। 

এছাড়া অন্য সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে গ্রুপটির খেলাপি ঋণ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কোম্পানির মালিক দেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

ব্যাংকের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে সালমান এফ রহমানের ১৭নং ধানমন্ডির বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। কিন্তু নিলামের ব্যাপারে স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হয়নি।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেক্সিমকোর সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আটকে যায়। এছাড়াও জিএমজি এয়ারলাইন্সের ঋণের বিপরীতে ২০১৬ সালে সালমান এফ রহমানের বাড়ি নিলাম ডেকেছিল সোনালী ব্যাংক। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রেতা মেলেনি। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এই নিলামেও ক্রেতা পাওয়া কঠিন হবে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন-বেক্সিমকো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। এখন পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে ব্যাংক গ্রাহকের সম্পত্তি নিলাম ডেকেছে। এখন এটাই চলমান প্রক্রিয়া। তবে এসব নিলামে সাধারণ ক্রেতা আসে না। ফলে এটি একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া মাত্র।

তিনি বলেন, টাকা আদায়ে বেক্সিমকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে এই মুহূর্তে বেক্সিমকোর টাকা পরিশোধের সক্ষমতা নেই। তিনি আরও বলেন, এর বাইরে ব্যাংকের খুব বেশি কিছু করার নেই।

বেক্সিমকোর ঋণ : বাংলাদেশ এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো) শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি। ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির মোট ঋণের স্থিতি ৬ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ৩ হাজার ১০৯ কোটি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রূপালী ব্যাংকে ঋণ ৪৮২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে বর্তমান নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ৯৯৩ কোটি টাকা পাওনার কথা বলা হয়েছে। বেক্সিমকোর দুটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা এবং বেক্সিমকো নিটিংয়ের নামে এই ঋণ নেওয়া হয়। পরে এই দুই কোম্পানি একীভূত হয়ে বেক্সিমকো টেক্সটাইলে (বেক্সটেক্স) রূপ নেয়। এরপর বেক্সটেক্সকে আবার বেক্সিমকো লিমিটেডের সঙ্গে একীভূত করা হয়।

রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেক্সিমকো টেক্সটাইলের কাছে রূপালী ব্যাংকের সর্বশেষ পাওনা ৯৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনাদায়ি সুদ অন্তর্ভুক্ত নয়। ব্যাংকের পাওনা, অন্যান্য খরচ এবং আদালতের সুদসহ আদায়ের জন্য তফসিলে বর্ণিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থায় নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতা হিসাবে সর্বশেষ নাম ‘বেক্সিমকো লিমিটেড’ উল্লেখ করা হয়েছে।

সার্বিকভাবে, রূপালী ব্যাংকের এই নিলাম বেক্সিমকোর ঋণ আদায়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ। জানতে চাইলে বেক্সিমকো লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, রূপালী ব্যাংকের এই নিলামের কথা আমি জানি না। কোম্পানি বন্ধ করে দিলে আমরা ঋণ পরিশোধ করব কীভাবে। তিনি বলেন-২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আমরা কোনো ঋণখেলাপি ছিলাম না। এরপর ড. ইউনূস সরকার আমাদের কোম্পানি বন্ধ করে দেয়। তার মতে, ‘কোম্পানি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ব্যবসা করার জন্য। ব্যবসা না করতে পারলে টাকা আসবে কীভাবে। কোম্পানি বন্ধ থাকায় হাজার শ্রমিক বেকার। কোম্পানিগুলোতে শুধু লোহা-লক্কড় পড়ে আছে। এই পরিস্থিতি হলে আমরা ব্যাংকের টাকা কীভাবে দেব।’

সম্পত্তি ও নিলাম : নারায়ণগঞ্জের তারাব ও যাত্রামুরা মৌজাতেও বেক্সিমকোর বন্ধক রাখা জমি নিলামের তালিকায় রয়েছে। তারাব মৌজার দুটি অংশে মোট ৮ দশমিক ৩৯ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে একটি অংশে ৪ দশমিক ৫২ একর এবং অন্য অংশে ৩ দশমিক ৮৭ একর জমির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাত্রামুরা মৌজার আরেক তফসিলে ৯ দশমিক ২ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই তিনটি তফসিলেই নারায়ণগঞ্জে ১৭ দশমিক ৪১ একর জমি রয়েছে। গাজীপুরের ৮ দশমিক ৫৫ একরসহ তফসিলে মোট ২৫ দশমিক ৯৬ একর জমির বিবরণ রয়েছে। এছাড়াও নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে গাজীপুরের জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর ও কাপাসিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক তফসিলের জমির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এসব জমির মধ্যে কোথাও একরের হিসাবে, আবার কোথাও শতাংশের হিসাবে জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।

গাজীপুরের একটি তফসিলে ২ দশমিক ১৯ একর, আরেকটিতে ৪৮ শতাংশ এবং অন্য একটি তফসিলে ৩ দশমিক ৬৬ একর জমির উল্লেখ রয়েছে। আরও কয়েকটি তফসিলে দশমিক একর ও শতাংশ হিসাবে জমি রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে গাজীপুর মৌজা সরাবো, থানা ও জেলা গাজীপুর এলাকায় ৮ দশমিক ৫৫ একর জমির পৃথক বিবরণও দেওয়া হয়েছে। সেখানে সিএস খতিয়ানের বিভিন্ন দাগে মোট জমির পরিমাণ ৮ দশমিক ৫৫ একর উল্লেখ করা হয়েছে।

নিলামে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার মধ্যে নির্ধারিত কার্যালয়ে দরপত্র জমা দিতে হবে। ওই দিন দুপুর ২টা ৫ মিনিটে দরপত্রদাতাদের উপস্থিতিতে দরপত্র খোলা হবে। নিলামে অংশগ্রহণকারীদের প্রস্তাবিত দরের ওপর নির্ধারিত হারে জামানত দিতে হবে। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দর হলে এর ওপর ২০ শতাংশ। ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে ১৫ শতাংশ। ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ১০ শতাংশ জামানত দিতে হবে। তবে সম্পত্তির প্রস্তাবিত মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কম বা অপর্যাপ্ত মনে হলে কর্তৃপক্ষ দরপত্র বাতিল করতে পারবে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর বেক্সিমকো টেক্সটাইল বিক্রির উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সময়ে এটি কেনার আগ্রহ দেখায় জাপানভিত্তিক প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠান রিভাইভাল গ্রুপ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠান ইকোনোমিল্লি। তখন তারা ২ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৫০ কোটি টাকা। তবে শেষ পর্যন্ত তা আটকে যায়। বেক্সিমকো টেক্সটাইলের নামে জনতা ব্যাংকে ঋণ রয়েছে ৮৬০ কোটি টাকা। এর পুরোটাই খেলাপি। এছাড়াও শুধু জনতা ব্যাংকেই বেক্সিমকো গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের ঋণ রয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়াও জিএমজি এয়ারলাইন্সের নামে নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৬ সালের ১২ জুলাই সালমান এফ রহমানের ধানমন্ডির বাড়ি নিলামে ডাকে সোনালী ব্যাংক। ওই সময়ে কোম্পানির নামে ব্যাংকের পাওনা ছিল ২২৮ কোটি টাকা। তবে নিলামে শেষ পর্যন্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি।

দেশের আর্থিক খাতের অত্যন্ত বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন সালমান। ঋণখেলাপি, জমি জালিয়াতি, অর্থ পাচার, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি বললেই তার নাম সবার আগে। তার হাত ধরেই দেশের ঋণখেলাপির সংস্কৃতির বিকাশ হয়। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত তার ২৮ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ৩ বছরে শেয়ারবাজার থেকে দৃশ্যমান ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে বেক্সিমকো সুকুক বন্ড ৩ হাজার কোটি, আইএফআইসি আমার বন্ড ১ হাজার কোটি টাকা এবং বেক্সিমকো জিরো কুপন বন্ড ছেড়ে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা নিয়েছেন। তবে অদৃশ্য ও বেনামি মিলিয়ে ৩ বছরেই ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এদিকে সুকুক বন্ড কেনার জন্য বিভিন্ন ব্যাংককে বাধ্য করা হয়। বেক্সিমকোর শেয়ারে কারসাজির দায়ে গত বছরের ১ অক্টোবর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণে ৫ আগস্ট বিদেশে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর দেশেই পালিয়ে ছিলেন সালমান এফ রহমান। সরকার পতনের কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকার নারায়ণগঞ্জ থেকে কোস্ট গার্ডের হাতে গ্রেফতার হন সালমান।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

গুজবেই তৈরি হচ্ছে জনমত তথ্যযুদ্ধে পিছিয়ে সরকার

তথ্যযুদ্ধে পিছিয়ে সরকার

উচ্চকক্ষ নিয়ে প্রশ্ন, সংসদে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত

উচ্চকক্ষ নিয়ে প্রশ্ন, সংসদে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ

পুলিশ সদর দপ্তরের সভায় উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা আস্থার সংকটে অস্থিরতা আরও বাড়ার শঙ্কা

আস্থার সংকটে অস্থিরতা আরও বাড়ার শঙ্কা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম