গলাচিপা ও লামা
খাল সাঁতরে যেতে হয় স্কুলে
Advertisement
বান্দরবান ও গলাচিপা দক্ষিণ (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাস্তা নেই। একের পর এক খাল। এসব খাল পার হতে নৌযান বা বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও নেই। তাই শীত, বর্ষা, বসন্ত-বারো মাসই সাঁতরে স্কুলে আসতে হয়। নিত্যদিনের এই দুর্ভোগ আর কত সহ্য করা যায়! এ কারণে স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন চরকারফারমা স্কুলে গিয়ে জানা যায় এ তথ্য।
একই চিত্র বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নেও। ১২টি গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে বমু খাল। প্রায় ১৮০ ফুট প্রস্থের এই খালের ওপর কোনো সেতু নেই। এতে এই গ্রামগুলোর লোকজনের যাতায়াতে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে বর্ষাকালে দুর্ভোগের শেষ নেই বললেই চলে। এই গ্রামের এক প্রান্তে রয়েছে চিনতাবাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে এই খাল পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন আসতে হয় শখানেক শিক্ষার্থীকে।
গলাচিপায় শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের দুর্ভোগ : গলাচিপা সদর থেকে ৮ কিলোমিটর দক্ষিণে সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চরকারফারমার অবস্থান। এখানে আসতে হলে বোয়ালিয়া স্লুইস গেটে যেতে হয়। সেখান থেকে আধা কিলোমিটার হেঁটে আগুনমুখার তীরে খেয়াঘাট। খেয়া পার হয়ে কারফারমা ঘাটে নেমে অন্তত পাঁচটি খাল সাঁতরে চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়। একদিকে যোগাযোগের জন্য নেই কোনো রাস্তা, অপরদিকে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খাল স্বাভাবিক চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এসব প্রতিকূলতাই যেন স্কুলটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়তি।
জানতে চাইলে স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র জহিরুল ইসলাম বলে, ‘আমার বাড়ি চরকারফারমার শেষ সীমানা ফরেস্টের পাশে। আমাগো বাড়ি দিয়া স্কুলে আইতে পাঁচটা খাল সাঁতরে আসতে হয়। প্রতিদিনই আমারা ৭-৮ জন একসঙ্গে খাল সাঁতরে স্কুলে আসি। বেশি বৃষ্টি থাকলে বই-খাতা ভিজে যায়।’
একই স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিন বলে, ‘বৃষ্টি ও খালের পানিতে শরীর সারা দিনই ভিজে থাকে। এতে শরীর খারাপ করে। বেশি খারাপ লাগলে কয়েকদিন বাড়িতেই থাকি। আমাগো একটা নৌকা আছে। কিন্তু ওই নৌকা দিয়া নদীতে মাছ ধরতে যায়, তাই খাল সাঁতরে স্কুলে আসি।’
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, ‘এই চরে ৮০টি পরিবার বাস করে। আমি জায়গা দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু রাস্তা করার সামর্থ্য আমার নেই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট করা দরকার।’
এ বিষয়ে গলাচিপা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই, কথাটি সত্য। আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তা নির্মাণের জন্য দেওয়া হবে।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম সগীর বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। রাস্তা না থাকায় স্কুলের শিক্ষার্থী কমে গেছে। বিষয়টি ইউএনও ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর ইজাজুল হক বলেন, ‘সামনের বরাদ্দ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার উপযোগী একটি রাস্তা করে দেব।’
প্রকৌশলীরা কতবার এসেছেন, সেতু হয়নি বমু খালে : লামার চিনতাবাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসাইন জানান, অন্তত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থে হলেও ব্রিজ খুবই প্রয়োজন। না হয় যে কোনো সময় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারে।
এলাকার জনপ্রতিনিধি মেনচিং মুরুং বলেন, এলজিইডি লামা উপজেলার প্রকৌশলীরা বেশ কয়েকবার মেপে গেছেন ব্রিজ তৈরির জন্য। কিন্তু পরে আর খবর পাওয়া যায়নি। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, দায় নেবে? হয়তো তখন তাদের ঘুম ভাঙবে।
চিনতাবাপাড়ার কারবারি লাঙি মুরুং বলেন, বমু খালে একটা ব্রিজ হওয়া খুবই দরকার। ছোট ছোট ছেলে মেয়ের খাল পাড় হয়ে পড়াশোনা করতে সমস্যা হচ্ছে।
এলজিইডি লামা উপজেলা প্রকৌশলী আবু হানিফ বলেন, ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। তবে একটু সময় লাগবে। আশা করছি একটা ব্যবস্থা হবে।
