বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য
মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা ফুলের বাজারেও
মাঠে ঘাম ঝরিয়ে লাভ নেই কৃষকের, বাজারে ক্রেতার কিনতে হচ্ছে চার থেকে পাঁচগুণ দামে * বিজয় দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বড়দিন, থার্টিফার্স্ট নাইট, পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও স্বাধীনতা দিবস ঘিরে লেনদেন হয় প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার
Advertisement
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কৃষকের জমিতে যত্নে ফোটা ফুল সুবাস ছড়ায় মানুষের মনে। আচার-অনুষ্ঠান, বিয়ে, গায়ে হলুদ, তারুণ্যের ভালোবাসা, উৎসব কিংবা শ্রদ্ধা-মানুষ কখনো প্রয়োজনে কখনো তার অনুভূতি প্রকাশে ফুল কিনে নেন। এই ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছেই। সেই সঙ্গে বাড়ছে বাণিজ্যও। বছরজুড়ে ফুলের বাজারে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না কৃষক। জমি থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদল হচ্ছে ফুল।
এই সুযোগে লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। ফলে খুচরা বাজারে ফুলের দাম বাড়লেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না চাষি। অন্যদিকে সেই ফুল কিনতে রাজধানীসহ বড় বড় শহরের ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে তিনগুণ দাম। অর্থাৎ ফুলের বাণিজ্য যত বাড়ছে, ততই ফুলে-ফেঁপে উঠছে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা।
এক হিসাবে দেখা যায়, বছরের পুরোটা সময় ফুলের চাহিদা থাকলেও ডিসেম্বর-এপ্রিল পর্যন্ত ফুলের বাণিজ্য বেশি জমে ওঠে। বিজয় দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বড়দিন, থার্টিফার্স্ট নাইট, পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও স্বাধীনতা দিবস ঘিরে ফুলের বেচাবিক্রি বেশি হয়। এ সময়েই প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ফুল বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি ফুল ব্যবসার সবচেয়ে বড় মৌসুম।
বাংলাদেশ ফুল ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এ মাসেই সারা বছরের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ ফুল বিক্রি হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশজুড়ে ফুল বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। আর পাঁচ মাসে বিক্রি ছিল ৪০০ কোটি টাকা।
যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম যুগান্তরকে বলেন, বছরজুড়েই এখন ফুল বিক্রি হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফুল বিক্রি ভালো হয়। এর মধ্যে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা ও মাতৃভাষা দিবস ঘিরে বেশি বাণিজ্য হয়। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার যশোর, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে ফুল উৎপাদন বাড়ছে। এসব জায়গা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা ফুল নিয়েছেন। এতে বিক্রিও বেড়েছে।
ইতোমধ্যে ডিসেম্বর ঘিরে সব প্রস্তুতি শেষ করছেন কৃষক। এবার ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ফুল বাণিজ্যের টার্গেট ধরা হয়েছে। আর বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা ও মাতৃভাষা দিবস ঘিরে পাইকারি এবং খুচরা পর্যায়ে ৩০০ কোটি টাকার ফুল বেচা-বাণিজ্যের টার্গেট ধরা হয়েছে। সব মিলে এবার বাণিজ্য ভালো হবে বলে আশা করছি। তিনি জানান, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল সামনে রেখে যশোরেই ১৫০ কোটি টাকা লেনদেন হবে। পাশাপাশি সাভারের সাদুল্লাহপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে ৭০-৮০ কোটি টাকার ফুল বাণিজ্য হবে। বাকিটা রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, আগারগাঁও ফুলের বাজারসহ দেশের অন্যান্য স্থান পূরণ করবে।
যশোরের গদখালী ইউনিয়নের ফুলচাষি নাসরিন নাহার আশা বলেন, আমরা যে দামে মাঠ থেকে ফুল বিক্রি করি, ক্রেতার কাছে খুচরা বাজারে তা দুই থেকে তিনগুণ দামে বিক্রি হয়। এতে লাভ যা করার মধ্যস্বত্বভোগী, খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা করেন। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে ভালোমানের প্রতি একশ গোলাপ ৯০০-১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটির দাম পড়ে ১০ টাকা। মাঝারি মানের ৭০০-৮০০ টাকা। ১০০ রজনিগন্ধা ৩০০-৪০০ টাকা। গ্লাডিওলাস ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে রংভেদে ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। জারবেরা ১০০ পিস ৫০০-১০০০, চন্দ্রমল্লিকা ১০০ পিস ২০০-২৫০, গাঁদাফুল প্রতি হাজার ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মাঠ থেকে এই ফুল স্থানীয় পাইকারি বাজারে শ হিসাবে ১০০-২০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।
কথা হয় সাভারের সাদুল্লাহপুর ইউনিয়নের (গোলাপ গ্রাম) ফুলচাষি নাসিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিবছর আমরা এ সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকি। ডিসেম্বর থেকেই ফুল বিক্রি বাড়বে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা আসবেন। মাঠে আমরা সব প্রস্তুতি শেষ করেছি।
এদিকে সারা দেশের খুচরা বিক্রেতারা রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট ও আগারগাঁওয়ে ফুলের পাইকারি মার্কেট থেকে ফুল কিনে থাকেন। সপ্তাহের অন্য দিনের চেয়ে শুক্র ও শনিবার বিক্রি বেশি হয়। প্রতিদিন শুধু রাজধানীর পাইকারি বাজারে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। আর বিশেষ দিবস যেমন: পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি বেশি হয়।
শুক্রবার শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ে ফুলের বাজারে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি পিস ফুলের দাম ৩০-৫০ টাকা বেশি। সেক্ষেত্রে মানভেদে একটি গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ টাকায়। একটু ভালো মানের গোলাপ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জারবেরা ৪০-৭০ টাকা, গাডিওলাস ৪০-৭০ ও রজনিগন্ধা ২০-৩০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। এছাড়া ৩৫০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এক হাজার গাঁদাফুল।
শাহাবাগ ফুলের বাজারে ফুল কিনতে আসা নাসরিন জাহান বলেন, বাজারে ফুলের দাম অনেক চড়া। বিক্রেতারা একপ্রকার জিম্মি করে বেশি দামে ফুল বিক্রি করছে। এছাড়া বিভিন্ন দিবসে এই ফুল বিক্রেতারা আমাদের পকেট কাটে। ৫০ টাকার ফুল ১৫০ টাকায়ও বিক্রি করে। সামনে একাধিক দিবস আসবে, সেসময় বিক্রেতারা ক্রেতাদের ঠকাবেন। তিনি জানান, অন্যান্য বাজারে তদারকি থাকলেও ফুলের বাজারে তদারকি নেই।
তাই এই বাজারেও তদারকি জোরদার করতে হবে। শাহবাগে ফুল বিক্রেতা মো. আনিসুল হক বলেন, এখানে সব সময় ফুল বিক্রি চাঙা থাকে। আর বিভিন্ন দিবস ঘিরে ফুল বিক্রি আরও জমজমাট হয়। আমরা কৃষকের মাঠ থেকে ফুল সংগ্রহ করি। পাশাপাশি বিভিন্ন হাতবদল হয়েও আমাদের কাছে ফুল আসে। যে কারণে পরিবহণ খরচ ও লাভ রেখে বিক্রি করতে হয়। এজন্য ফুলের দাম একটু বেশি হয়ে পড়ে। আর দিবসে একটু বাড়তি লাভের আশায় ফুলের দাম বাড়ে।

