ব্যাটারি রিকশা যেন সড়কে ‘মৃত্যুফাঁদ’
ছয় বছরে প্রাণ গেল ৭৬০৪ জনের * অভিজ্ঞতাহীন ৭৫ শতাংশ চালক, ৩০ শতাংশ যাত্রী দুর্ঘটনার শিকার, নেই মানসম্মত কাঠামোও * নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা, বিকল্প পরিবহণ অথবা বিজ্ঞানসম্মত সংস্কার হলে কর্মহীন হবেন লাখো চালক * সড়কে নিরাপত্তা ও চালকদের কর্মসংস্থান-দুদিক সামলানোর তাগিদ
Advertisement
যেখানে মূল সড়কে চলারই কথা নয় প্যাডেল বা ব্যাটারিচালিত রিকশার, সেখানে এর দাপটে অন্য গণপরিবহণের চলাই মুশকিল। তোপখানা রোডের এ চিত্র পুরো রাজধানীরই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামালপুর থেকে রাজিব পরিবহণের একটি বাস ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। বাসটি জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের লাহিড়ীকান্দা ঈদগাহ মাঠ এলাকা পার হচ্ছিল। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। এতে রিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং বাসটি উলটে খাদে পড়ে। ঘটনাস্থলেই চারজন প্রাণ হারান। তাদের দুজন ছিলেন রিকশার যাত্রী। আহত হন আরও অন্তত ১৫ জন।
নিয়মনীতি না মেনে মহাসড়কে অবৈজ্ঞানিক ত্রিচক্রযানটির চলাচল বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহাসড়কের পাশাপাশি অলিগলিতেও বাড়ছে দুর্ঘটনা। নানা উদ্যোগেও থামানো যাচ্ছে না এই যানটির বিস্তার। বরং জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সংখ্যা। কম শারীরিক পরিশ্রমে বেশি আয়ের আশায় ঝুঁকছেন চালকরাও। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিকল্প পরিবহণ চালুর পাশাপাশি নীতিমালা বাস্তবায়ন করে কাঠামোগতভাবে নিরাপদ অটোরিকশা সড়কে নামাতে হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যানে প্রাণহানির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালেই অটোরিকশা ও তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে গত জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা ৭ হাজার ৬০৪। এ সময়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে তিন চাকার ১২ হাজারের বেশি যানবাহন। এ পরিসংখ্যানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার তথ্যও রয়েছে।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ বলছে, সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে অন্তত ৮০ লাখ। এর মধ্যে ৩০ লাখের বেশি রাজধানীতে। প্রতিদিন সারা দেশে যোগ হচ্ছে অন্তত ৩ হাজার। ফলে সড়ক আরও অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
অভিজ্ঞতাহীন চালক : ‘আরবান মবিলিটি স্টাডি : রিকশা ইন ট্রানজিশন’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, অটোরিকশার ৭৫ শতাংশ চালকেরই অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রায় ৬০ শতাংশের অভিজ্ঞতা দুই বছরের কম। বিপরীতে প্যাডেল রিকশা চালকদের গড় অভিজ্ঞতা ১৫ বছর। অটোরিকশা চালকদের অনেকে ট্রাফিক আইন না মেনে বেপরোয়া গতিতে চলেন। উলটো পথে যাওয়া, যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা, এমনকি ব্যস্ত ফ্লাইওভার বা মহাসড়কের লেনে চলাচলের কারণে দ্রুতগামী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটছে। আবার নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছাড়াই এসব রিকশা সংযোজন করা হয়, যা সড়কে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। জরিপ অনুযায়ী, অটোরিকশার ৩০ শতাংশ যাত্রী দুর্ঘটনার শিকার হন। প্যাডেল রিকশার ক্ষেত্রে এ হার ১৮ শতাংশ। অটোরিকশার দুর্ঘটনায় ৪৪ শতাংশ যাত্রী অত্যন্ত গুরুতরভাবে আহত হন, যা প্যাডেল রিকশার তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি ভয়াবহ।
ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, দুর্ঘটনার জন্য একপেশেভাবে অটোরিকশাকে দায়ী করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিআরটিএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় নিহত ৩ হাজার ২৫৭ জনের মধ্যে মোটরসাইকেলে ৮৯৩ এবং ট্রাকে ৪৫২ জন। রিকশায় নিহত ১৩৬ জন। তাই দুর্ঘটনা রোধে সামগ্রিক সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থার সংস্কার দরকার।
বিকল্প ভাবনা : অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এতে অটোরিকশা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হচ্ছে না। দুর্বল অবকাঠামো ও ঝুঁকিপূর্ণ যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় চলা রিকশার পরিবর্তে কাঠামোগতভাবে নিরাপদ রিকশা সড়কে নামানোর চেষ্টা চলছে। যেসব অটোরিকশার যান্ত্রিক সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলো নির্ধারিত ফিটনেস সনদ নিয়ে চলবে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইনজামুল হক বলেন, স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকার মতো অটোরিকশা নিষিদ্ধ করে প্যাডেলচালিত রিকশা উন্মুক্ত করা উচিত। ফুটপাত চলাচলের উপযোগী করে হাঁটা ও সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু চার চাকার বৈদ্যুতিক শাটল গাড়ির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এতে নিরাপদে অন্তত ১০ জন যাত্রী বহন করা যায়। এমন পরিবহণ অটোরিকশার নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বিকল্প হতে পারে। ভালো বাস সার্ভিস চালু হলে অটোরিকশার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
চালকদের কর্মসংস্থান : নীতিমালা বাস্তবায়ন বা বিকল্প পরিবহণ চালু হলে চালকদের বড় অংশের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, লাইসেন্স বা রুট পারমিট না লাগায় অনেকেই রাতারাতি এ পেশায় এসেছিলেন। ফলে কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো খাতে শ্রমিক সংকট চলছে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে এলে আগের পেশায় জনবল ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তাদের কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।
জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৭ শতাংশ ব্যাটারি রিকশাচালক ভবিষ্যতে অন্য পেশায় বা অন্য যানবাহন চালাতে আগ্রহী। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের ভারী বা মাঝারি যানবাহনের চালক হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব।
ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের নেতা খালেকুজ্জামান বলেন, এ খাতের সঙ্গে সরাসরি ৬০ লাখ মানুষ জড়িত। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া নিষিদ্ধ করলে লাখো পরিবার পথে বসবে। রিকশার গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারে নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ ও আদর্শ কাঠামোগত নকশা তৈরি করে নীতিমালার আওতায় আনা সম্ভব। এজন্য অন্তত দুই বছর সময় দেওয়া উচিত।

