Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

বিচারকদের সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতচক্র চিহ্নিত

লাখ টাকার চুক্তিতে জাল রায়

Advertisement

মহিউদ্দিন খান রিফাত

মহিউদ্দিন খান রিফাত

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লাখ টাকার চুক্তিতে জাল রায়

Advertisement

আদালতের নথি চুরি করে লাখ টাকায় তৈরি করা হয় জাল রায়। বিচারকের সিল-স্বাক্ষর নকল করে ওই রায়ে আসামিকে খালাস বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়। এ কাজের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তি হতো। অপরাধ ও কাজের ধরন বুঝে টাকার অঙ্ক আরও বাড়ত। আদালতের নথি চুরি ও বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া রায় তৈরির এমন একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এর আগে গত ২৮ জুলাই ঢাকার অধস্তন আদালতে এমন একটি চক্রের জাল-জালিয়াতি নিয়ে ‘টাকায় মেলে বিচারকের স্বাক্ষর’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তর। এরপর নড়েচড়ে বসে আদালত ও পুলিশ প্রশাসন। পরে অনুসন্ধান চালিয়ে পুলিশ এ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে আদালতে তিনজন দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই জালিয়াতিতে আইনজীবী, মুহুরি, উমেদার, কম্পিউটার অপারেটরদের যৌথ সিন্ডিকেট সক্রিয়।

জবানবন্দি ও তদন্তে উঠে এসেছে, পেনড্রাইভে করে ভুয়া আদেশের তথ্য এনে কম্পিউটারে রায় তৈরি, জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্রিন্ট এবং বিচারকের স্বাক্ষর ও আদালতের সিল জাল করে চলে পুরো প্রক্রিয়াটি। এমনকি জাল রায় দেখিয়ে পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে গেলে আসামি খালাসের কপি দেখিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে প্রকৃত তথ্য যাতে যাচাই করা না যায়, সেজন্য মূল মামলার নথি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হতো। এমনকি এ ধরনের দুটি নথি গায়েব করে দিতে সক্ষমও হয় চক্রটি।

পুলিশের অভিযানে চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে সম্প্রতি উদ্ধার হয়েছে চুরি যাওয়া দুটি মূল নথি। জব্দ করা হয়েছে একটি কম্পিউটার, যাতে অন্তত ১৫টি ভুয়া রায়ের সফটকপি পাওয়া গেছে। এরপর চক্রটির পরিধি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি কে এম রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘এ চক্রকে ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। চক্রটির সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা আমরা তদন্ত করে দেখছি। যাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে।

উমেদারের সহযোগিতায় নথি চুরির সুযোগ : আদালতের নথি চুরির ঘটনায় উমেদারদের জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। সম্প্রতি ঢাকার দুটি আদালত থেকে মামলার নথি চুরির ঘটনায় চক্রের সদস্যরা উমেদারদের ঘুস দিয়ে নথি হাতে নেওয়ার সুযোগ পায়। এক ঘটনায় ১ হাজার টাকা এবং আরেক ঘটনায় একই অঙ্কের টাকা দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নথি চুরিতে জড়িত থাকা উমেদারদের এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতের সরকারি কর্মচারী না হয়েও উমেদাররা নিয়মিত নথি আনা-নেওয়া ও বিচারপ্রার্থী-আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপরাধীচক্র তাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত নথিতে প্রবেশ করছে। ফলে উমেদারদের মাধ্যমে চক্রটি নথি সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে।

এজলাস থেকে মূল নথি চুরি : গত ২ জুলাই ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-২ আদালতে একটি মামলার মূল নথি দেখার কথা বলে আইনজীবীর মুহুরি পরিচয়ে প্রবেশ করেন এক ব্যক্তি। আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান তাকে টাকার বিনিময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর ৪০৯/২১-এর মূল নথি দেখান। এর কিছুক্ষণ পর বিচারক নাজমুলকে পাশের চেম্বারে ডাকেন। এ সুযোগে নথি নিয়ে পালিয়ে যান ওই ব্যক্তি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনি মূল নথি নিয়ে করিডর ও সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত আদালত চত্বর থেকে বেরিয়ে যান। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩৮০ ধারায় মামলা হয়। তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ প্রথমে আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল ওরফে ‘মুরগি রাসেল’কে গ্রেফতার করে।

রাসেলের তথ্যেই অর্পা : পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদের পর রাসেলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুগদা এলাকা থেকে জামিলা আক্তার ওরফে অর্পা নামের এক নারীকে গ্রেফতার করা হয়। তার বাসার আলমারি থেকে চুরি যাওয়া দুটি মূল নথি উদ্ধার করা হয়। এর একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর ৪০৯/২১ এবং অন্যটি ভাটারা থানার মামলা নম্বর ৪৭(৭)/২০২০। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অর্পা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা ৪০৯/২১-এর আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রবির স্ত্রী। তানভীর সৌদি আরবে রয়েছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, বিচারিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত বা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে রাসেলের সহায়তায় অর্পা নথি দুটি সরিয়ে নেন।

জবানবন্দিতে চক্রের কাজের ধরন : আদালতের জবানবন্দিতে চক্রের সদস্যরা জানায়, চক্রটির মূল কাজ ছিল আদালতের নথি চুরি করে সেগুলোর তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া আদেশ তৈরি করা। চক্রের একজন কম্পিউটার অপারেটর বাইরে থেকে পেনড্রাইভে করে মামলার তথ্য নিয়ে আসতেন। পরে ওই তথ্য দিয়ে কম্পিউটারে ভুয়া রায় তৈরি করে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্রিন্ট করা হতো। এরপর সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের জাল স্বাক্ষর এবং আদালতের সিল নকল করে নথিটিকে আসল রায়ের মতো তৈরি করা হতো। এসব ভুয়া আদেশে কোনো আসামিকে খালাস বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে-এমন তথ্য উল্লেখ থাকত। পরে তা সংশ্লিষ্ট আসামি বা তাদের স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। জবানবন্দিতে আরও বলা হয়েছে, ভুয়া রায় দেখিয়ে কোনো আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করতে গেলে ওই নথি দেখিয়ে প্রশ্ন করা হতো-তিনি তো মামলায় খালাস পেয়েছেন, তাহলে তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে কেন? এভাবে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার পর মূল মামলার নথি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হতো, যাতে প্রকৃত তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একই ব্যক্তিরা আদালতের নথি চুরি এবং ভুয়া রায় তৈরির পৃথক ঘটনায় যুক্ত ছিলেন। নথি চুরির জন্য ‘অর্পা’ নামের এক নারীকে ব্যবহার এবং একজন আইনজীবীর সাবেক মুহুরির মাধ্যমে নথি সরানোর তথ্য সামনে এসেছে।

৫০ থেকে এক লাখে কাজ, বড় চুক্তি আরও বেশি : জবানবন্দি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে চক্রটির অর্থ লেনদেনের তথ্যও উঠে এসেছে। সেখানে বিভিন্ন কাজের জন্য ৫০ হাজার, ৭০ হাজার ও লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তির তথ্য পাওয়া গেছে। কাজের ধরন ও ঝুঁকি অনুযায়ী টাকার অঙ্ক বাড়ত বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্তে অসাধু আইনজীবী, আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মচারী, উমেদার, মুহুরি ও কম্পিউটার অপারেটরদের জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

রাসেলের জবানবন্দিতে আইনজীবীর নাম : সংশ্লিষ্টরা জানান, রাসেল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি নোটারি আইনজীবী আসমা খাতুনের নাম উল্লেখ করেন এবং জাল সিল ও বিচারকের স্বাক্ষর ব্যবহার করে আদেশ তৈরির তথ্য দেন। এর ভিত্তিতে গত ২২ আগস্ট ঢাকার আইনজীবী সমিতি ভবনের দ্বিতীয়তলা থেকে আসমা খাতুনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালত এলাকায় কম্পিউটার দোকানের অপারেটর আহসান হাবীব নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, রাসেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা ৪০৯/২১-এর ভুয়া রায়ের কপি আহসানের কম্পিউটার থেকে তৈরি করা হয়েছিল। আহসানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আহনাফ ট্রান্সলেশন সেন্টারের কম্পিউটার পরীক্ষা করে একটি ফোল্ডারে অন্তত ১৫টি মামলার ভুয়া রায়ের সফটকপি পাওয়া যায়। ফোল্ডারটিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা ৪০৯/২১, ভাটারা, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, তুরাগ, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ, লালবাগ ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন মামলার রায়ের সফটকপি ছিল। পুলিশ কম্পিউটারটি জব্দ করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই ১৫ মামলার রায়ের কপির মধ্যে কোনগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং সেগুলোর সঙ্গে আরও কারা জড়িত তা খোঁজা হচ্ছে।

মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য : আহসান হাবীব ও আসমা খাতুনকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর মুখোমুখি করা হয়। চক্রটির সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং আদালতের কোন কোন নথি ব্যবহার করে ভুয়া আদেশ তৈরি করা হয়েছে, তা জানতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানায় পুলিশ।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

টার্গেট ডিসেম্বর রাজনীতি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কারা

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কারা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন রূপরেখা প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব উচ্চকক্ষ থেকে

প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব উচ্চকক্ষ থেকে

থাইল্যান্ডে বসে চালাচ্ছেন দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ রাজী ফখরুল এখনো বেপরোয়া

শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ রাজী ফখরুল এখনো বেপরোয়া

হামলার আশঙ্কায় বন্ধ ব্যাংক-ভূমিসেবাসহ বহু ওয়েবসাইট সাইবার সুরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

সাইবার সুরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম