Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

ক্ষতবিক্ষত তানিয়া কাতরাচ্ছে মেঝেতে

Advertisement

আরমান ভূঁইয়া

আরমান ভূঁইয়া

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষতবিক্ষত তানিয়া কাতরাচ্ছে মেঝেতে

খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে শিক্ষিকার নির্যাতনের শিকার শিশু -যুগান্তর

Advertisement

হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে কাতরাচ্ছে ১১ বছরের তানিয়া। যে বয়সে স্কুলের বারান্দায় সহপাঠীদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে মেতে থাকার কথা, সেই বয়সে শরীরজুড়ে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে শিশুটি। মাথায় সেলাই, পিঠে গভীর ক্ষত, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন, কোমরের হাড় ভাঙা। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি ও নির্যাতনে হারিয়েছে হাঁটার শক্তিও। ঠিকমতো সে কথাও বলতে পারছে না।

খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা তানিয়াকে দেখলে আঁতকে উঠছেন স্বজন ও হাসপাতালের লোকজন। তার শারীরিক অবস্থা এখন সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। পরিবারের অভিযোগ, ঢাকার মিরপুরে গৃহকর্মীর কাজে থাকা অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে।

অভাবের সংসারে বাবার বোঝা কিছুটা কমবে, মেয়েটিও হয়তো ভালো থাকবে-এমন আশায় প্রায় দেড় বছর আগে সাড়ে ৯ বছর বয়সে তানিয়াকে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজে পাঠিয়েছিলেন দিনমজুর বাবা বেলাল হোসেন। কিন্তু ভালো ভবিষ্যতের সেই আশাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেড় বছর পর মেয়েটি বাড়ি ফিরেছে ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে।

তানিয়ার বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামে। ছয় বছর বয়সে মাকে হারায় তানিয়া। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়ে আরও কঠিন হয়ে পড়ে বেলালের সংসার। স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত তানিয়া।

একপর্যায়ে প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন বেলাল। প্রথমে মেয়েটিকে দিয়ে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদসংলগ্ন একটি বাসায় কাজ করানো শুরু হয়। পরে সেই বাড়ি থেকে তাকে ঢাকায় গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তার ওরফে সুবনার বাসায় আনা হয়। সেখানেই তার ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন।

তানিয়া জানায়, ঢাকার মিরপুরের একটি বাসায় তাকে রাখা হয়েছিল। সেখানে গৃহকর্তার নাম রাসেল এবং গৃহকর্ত্রীর নাম সুবনা। রাসেলের মিরপুরে ল্যাপটপের দোকান এবং তার স্ত্রী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন বলেও জানিয়েছে শিশুটি।

তানিয়ার অভিযোগ, ওই বাসায় যাওয়ার পর থেকেই তাকে ভয়ভীতি দেখানো ও নির্যাতন করা হতো। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতিদিনই তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

কয়েকদিন আগে মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাতের পর তানিয়াকে ঢাকার ওই বাসা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান সুবনার পরিবারের সদস্যরা। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান বাবা বেলাল। পরে শুক্রবার রাত ৩টার দিকে মেয়েকে এনে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করান বাবা। বর্তমানে মেয়ে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে বেড না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা চলছে।

খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, শিশুটির শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।

মেয়েকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়েটা যেন বেঁচে থাকে। উন্নত চিকিৎসা পায়। একটু ভালো ভবিষ্যতের আশায় যাকে দূরে পাঠিয়েছিলাম, সেই মেয়েকে যেন আবার সুস্থ শরীরে নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারি।’

এদিকে মিরপুরের ওই বাসার সঠিক ঠিকানা জানেন না বেলাল। তিনি বলেন, দুবার ওই বাসায় গেলেও তাকে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ফলে এখন অভিযুক্তদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে অভিযুক্ত গৃহকর্ত্রীর পরিচয় ও ঠিকানা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। জাতীয় পরিচয়পত্রে দেওয়া পূর্ব শেওড়াপাড়ার ১১৮৮/১ নম্বর ঠিকানায় গিয়েও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। অভিযুক্তের বাসার ঠিকানা এখনো পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা ঢাকায় আসছেন। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযুক্তদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।’

তবে তানিয়াকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা আক্তার ওরফে সুবনা। মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, ‘আমি তানিয়াকে নির্যাতন করিনি। ছয়-সাত মাস আগে পানি গরম করতে গিয়ে তানিয়ার শরীরে পড়ে যায়।

আর একদিন আমার ছোট মেয়ে এক গ্লাস গরম পানি তার শরীরে ফেলে দেয়। এছাড়া তাকে কেউ নির্যাতন করেনি।’

খাগড়াছড়ির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি সৃজনী ত্রিপুরা বলেন, ১১ বছরের তানিয়া শিশু হিসাবে আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। একই সঙ্গে গৃহকর্মী হিসাবেও তার অধিকার রয়েছে। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১৫ অনুযায়ী নির্যাতনের শিকার কোনো গৃহকর্মীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। নির্যাতনের ফলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়া দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায়ও গুরুতর আঘাতের ঘটনায় শাস্তির সুযোগ রয়েছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

টার্গেট ডিসেম্বর রাজনীতি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কারা

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কারা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন রূপরেখা প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব উচ্চকক্ষ থেকে

প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব উচ্চকক্ষ থেকে

থাইল্যান্ডে বসে চালাচ্ছেন দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ রাজী ফখরুল এখনো বেপরোয়া

শেখ পরিবারের ‘ঘনিষ্ঠ’ রাজী ফখরুল এখনো বেপরোয়া

হামলার আশঙ্কায় বন্ধ ব্যাংক-ভূমিসেবাসহ বহু ওয়েবসাইট সাইবার সুরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

সাইবার সুরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম