নৃশংস বর্বরতায় অপ্রতিম হত্যা
ঘরে ঘরে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা
মায়েদের মনে একটাই প্রশ্ন-আমার সন্তান কি নিরাপদে বাড়ি ফিরবে? * অপ্রতিমের বয়স তেরো, এই সংখ্যাকে সরকারি ভবনের কপালে লিখে দিতে চাই -শামসুজ্জামান দুদু
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নির্মম হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ পুরো দেশ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম। ২২ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর তার মরদেহ শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়।
এমন নৃশংসতার পর ঘরে ঘরে অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এর আগে মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ আর শোকের ঝড় ওঠে, যা আজও কেউ ভুলতে পারেনি। সেই ক্ষত না শোকাতেই অপ্রতিমের ক্ষতবিক্ষত লাশ নাড়া দিচ্ছে আপামরসাধারণকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক মা-বাবা। তাদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন-আমার সন্তান কি নিরাপদে বাড়ি ফিরবে? একের পর এক এমন নির্মম শিশুহত্যার ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘অপ্রতিমের বয়স তেরো। এই সংখ্যাকে আজ আমি শহরের সব সরকারি ভবনের কপালে কালি দিয়ে লিখে দিতে চাই, কারণ তেরো বছর বয়সে একটি ছেলের পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল স্কুলের মাঠ, বন্ধুর মুখ, মায়ের রান্নাঘর, পরীক্ষার খাতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য নির্বোধ স্বপ্ন; অথচ এই দেশ তাকে তার ভবিষ্যৎসহ গিলে ফেলেছে এবং আমরা এখন সভ্য মানুষের মতো বসে তার মৃত্যুর কারণ খুঁজছি।’
অপ্রতিমকে হত্যার পর নাট্য ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মিজানুর রহমান আরিয়ান ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘সন্তানকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না বানিয়ে প্রবাসী বানান। দূরে থাক, তবু বেঁচে থাক।’ নাট্য ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পূজা চেরী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরটি দেখে সত্যিই আমি গভীরভাবে মর্মাহত। একজন মায়ের একমাত্র সন্তান, একটি পরিবারের স্বপ্ন-এভাবে অকালে ঝরে যাবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। একটি শিশুর এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, আমাদের সবার হৃদয়ে গভীর শোকের ছাপ রেখে যায়। অপ্রতিমের পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা ও প্রার্থনা রইল। সৃষ্টিকর্তা যেন তার পরিবারকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দেন।’
বিচারের দাবি জানিয়ে পূজা লেখেন, ‘এ ঘটনার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যটা সামনে আসুক এবং যারা দায়ী, তারা যেন আইনের আওতায় আসে-এটাই প্রত্যাশা। অপ্রতিম, তুমি শান্তিতে থেকো। তোমার জন্য রইল অশেষ ভালোবাসা ও প্রার্থনা।’
গণমাধ্যমকর্মী দীপ্তি চৌধুরী বলেছেন, ‘যে দেশে শিশু নিরাপদ নয়, সেই দেশ থেকে আর কী আশা করা যায়? দীর্ঘদিন ধরে শিশু নিখোঁজ ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলছি। কাছ থেকে দেখেছি, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল অংশ এ বিষয়ে উদাসীন।’
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ইসরাত জাহান সান্ত্বনা যুগান্তরকে বলেন, ‘এসব ঘটনা দুই-চার দিন আমাদের খুবই দুঃখিত করে, তারপর আরেকটি ঘটনার ধাক্কায় আমরা তা ভুলে যাই। সমাজের এতটাই অধঃপতন হয়েছে যে, খুব সামান্য ঘটনায়ই মানুষ খুন হয়ে যাচ্ছে। এই অধঃপতনের জন্য আসলে কে দায়ী, আর সামাজিক এই অবক্ষয়ের মূল কারণ কী-সেই গভীরে আমরা যেতে পারছি না। দিনদিন মানুষের মানসিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা ঢুকে যাচ্ছে। মাদ্রাসায় ছেলেশিশু বলাৎকারের শিকার হচ্ছে, অথচ সে কাউকে বলতে পারছে না। বাচ্চাদের ঘরের বাইরে পাঠালেই তারা অনিরাপদ। এটা কী ধরনের সমাজ?’ সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশের এমন পরিস্থিতিতে জনগণকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। এমন নৃশংস ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে, তখন সবাই উদ্বেগে পড়ে যায়। এমন ঘটনা আমরা আর চাই না; এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশুর খেলাধুলার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ দরকার। স্কুলেও যেন শিশুর জন্য একটি পাঠাগার থাকে-যেখানে তারা লাইব্রেরিতে বই পড়বে এবং বিশাল মাঠে খেলাধুলা করবে।’ সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং শিশু মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ যুগান্তরকে বলেন, ‘শিশুর ওপর এমন নৃশংসতার প্রধান কারণ সামাজিক সচেতনতার অভাব, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকা এবং জবাবদিহি না থাকা।’
দৃষ্টান্তমূলক বিচারও হচ্ছে এবং কয়েকজনের ফাঁসিও দেওয়া হয়েছে, তবুও এসব অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না উল্লেখ করে ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘শুধু দৃষ্টান্তমূলক বিচার বা ফাঁসি দিয়েই সব সমস্যার সমাধান হয় না। আইনকে ভয় করতে হবে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং আইন যেন যথার্থভাবে প্রয়োগ হয়, সেই সামাজিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। প্রশাসনিক সক্ষমতা ও পুলিশের দক্ষতা বাড়াতে হবে। পুলিশকে যেন মানুষ শ্রদ্ধা করে এবং একই সঙ্গে আইনের ভয় থাকে-এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’
দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই অস্থিরতা আগেও ছিল, এখনো চলছে। যতক্ষণ রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা না আসবে, ততক্ষণ শিশু অপরাধের মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’
নাম প্রকাশ না করে একজন সিনিয়র সাংবাদিক যুগান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্র, সমাজ ও সরকারের দায়িত্ব থাকলেও আমাদের মা-বাবাকে অবশ্যই খোঁজ রাখতে হবে সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে। সন্তানের প্রথম শিক্ষক মা-বাবা, প্রথম ডাক্তার মা-বাবা এবং প্রথম পুলিশও হতে হবে মা-বাবা।’
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, বছরের প্রথম আট মাসে ৩৬ জন নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার ছাড়াও চলতি বছর শিশু ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং স্বজনদের সঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো হত্যাকাণ্ডে পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের একটি শিশু ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। ১২ সেপ্টেম্বর সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯, ধর্ষণের পর হত্যা (দুই ছেলেশিশুসদৃশ ঘটনা সহ) ২৬, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪, গুলিতে ৩, গৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনে ২, উত্ত্যক্তকারীর হাতে ২ এবং অপহরণের পর ১ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের আরও ৯৯টি ঘটনা রয়েছে।
সম্প্রতি একের পর এক শিশুহত্যার লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সি এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী নিখোঁজ হয় এবং ১৬ সেপ্টেম্বর বাড়ির পাশের ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১৯ মে সকালে মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে ৮ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর মাথাহীন দেহ এবং বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটি প্রতিবেশীর লালসার শিকার হয়; নিজ ফ্ল্যাটে ঢোকার আগেই পাশের ফ্ল্যাটের মাদকাসক্ত সোহেল রানা তাকে টেনে বাথরুমে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যার আগে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। সে মিরপুর পল্লবীর পপুলার মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হলেও ৮৭ শতাংশের বেশি শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩,৬৭৯। সেই হিসাবে এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২,০৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।

