রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর
আম্মারের নেতৃত্বে তাণ্ডব
রেলস্টেশন ভাঙচুরে বাধা দেওয়ায় বিএনপি-ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও * সরকারি সম্পদের নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতি সব মহলের নিন্দা * রেলের চারজন সাময়িক বখরাস্ত, তদন্ত কমিটি
রাজশাহী ব্যুরো ও রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ওপর রেলের নিরাপত্তা বাহিনী ও টিটির হামলার ঘটনায় রোববার রাতে ভাঙচুর করা রেলস্টেশন -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে রাজশাহী রেলস্টেশনে দফায় দফায় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী স্টেশনের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক তাণ্ডব চালান। হামলা থেকে রক্ষা পায়নি রেল থানাও। গত রোববার রাত ১০টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় এই সহিংসতা চলে। নজিরবিহীন এই তাণ্ডবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। এ ঘটনায় অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এ সময় হামলা বন্ধের আহ্বান জানালে রাজশাহী মহানগর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হন উত্তেজিতরা। হামলার সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ ঘটনায় ওই দিন রাত ৯টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল।
এদিকে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় পশ্চিম রেল কর্তৃপক্ষ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। গঠন করা হয়েছে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি। আর বেধড়ক মারধরের শিকার ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাবি শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী তার চাচাকে রিসিভ করতে রাজশাহী রেলস্টেশনে যান। এ সময় স্টেশনে ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আনসার সদস্যদের কথা কাটাকাটি হয়। তখন আইয়ুব ওই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলায় আরএনবির সদস্যরা তাকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে আইয়ুব মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আম্মারের ফেসবুক পোস্ট : নির্যাতনে রেলস্টেশনে পড়ে থাকা আইয়ুবের ছবি প্রকাশের পর রাবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস আম্মার ফেসবুকে এক পোস্টে প্রতিবাদ জানান। তিনি লিখেন, এক ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করলে প্রতিটি ট্রেন থেকে দুজন করে স্টাফ আটক করা হবে। এরপর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশনে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি জানান। এ সময় আগুন জ্বালিয়ে রেলপথ অবরোধ করা হয়। এতে রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।
আম্মারের নেতৃত্বে রাজশাহী স্টেশনে হামলা : এর ঘণ্টাখানেক পর আম্মার ‘লংমার্চে’-এর ঘোষণা দেন। সেই আহ্বানে রাত ১০টার দিকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে নগরীর রাজশাহী রেলস্টেশনের দিকে রওয়ানা দেন শিক্ষার্থীরা। রাতে সাড়ে ১০টা থেকে স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর শুরু হয়। প্রথমে তারা লোহার পাইপ, গাছের ডাল, বাঁশ, লাঠি ও ইট-পাটকেল দিয়ে প্রবেশদ্বারের কাচ ভেঙে ফেলেন। এরপর আনসার বক্স, বিশ্রামাগার, টিকিট কাউন্টার তছনছ করেন। রক্ষা পায়নি ডাস্টবিন, দোকানপাট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষ, সাইনবোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরাও। এমনকি রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়েও ব্যাপক ভাঙচুর হয়। এ সময় আম্বারের অনুসারীদের পাশাপাশি জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুর ইসলামকেও ভাঙচুরে অংশ নিতে দেখা যায়। শিবিরের কর্মীরাও সেখানে অংশ নেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
বাধা দেওয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও : স্টেশনে ভাঙচুরের খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ এবং সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব এমদাদুল হক লিমনসহ দেড় শতাধিক নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত হন। রাসিক প্রশাসকসহ নেতারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তারা শিক্ষার্থীদের মারধরে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এ সময় তাদের ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়।
বিএনপি নেতাকর্মীরা ভাঙচুরে বাধা দেওয়ায় তাদের ওপর চড়াও হন শিক্ষার্থীরা।
পরে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম ও প্রক্টর মাহবুবুর রহমানসহ প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন শিক্ষক উপস্থিত হন। তারা অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফেরেন।
বিএনপি ও ছাত্রদল নেতার বক্তব্য : রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, আমরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করেছি। শিক্ষার্থীকে মারধরে জড়িতদের শাস্তি চাই। ভাঙচুরে গুটিকয়েক সাধারণ শিক্ষার্থী ছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠরা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত দরকার।
ছাত্রদল নেতা এমদাদুল হক লিমন বলেন, আম্মারের নেতৃত্বেই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।
চারজন বরখাস্ত ও তদন্ত কমিটি : শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় রোববার রাতেই পশ্চিম রেলের চিফ কমান্ড্যান্ট মোহা. আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে চার আরএনবি সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন-আরিফ হোসেন, রোকন উদ্দীন, শফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেন। সোমবার তদন্ত কমিটির বিষয়টি নিশ্চিত করেন পশ্চিম রেলের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম।
আইয়ুব আলীর শারীরিক অবস্থা : ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক খুরশিদ আলম বলেন, ‘আহত আইয়ুব আলী মোটামুটি ভালো আছেন। তার চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর আমরা রাখছি।’
বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ : রেলস্টেশনে এমন হামলায় বিভিন্ন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, ‘যারা এখানে ছাত্রদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা সুস্থ নন। তারা যেসব সরকারি সম্পদ ধ্বংস করেছেন, সেগুলো আমাদের ট্যাক্সের টাকার সম্পদ। ছাত্রকে মারধরের ঘটনায় আমি নিন্দা জানাচ্ছি। জড়িতদের শাস্তি দিতে হবে। আর যারা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়েছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’
তাসনিম আলম সৈকত নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফেসবুকে লিখেছেন, খুবই তুচ্ছ একটি ঘটনা। ফলাফল-কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট। হাজার মানুষের ভোগান্তি। কবে আমরা মানুষ হব।
জিএস আম্মারের বক্তব্য : আপনার নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা গিয়ে স্টেশনে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন, সেটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে জিএস আম্মার বলেন, গত দুই মাসে শিক্ষার্থীদের ওপর চার থেকে পাঁচবার হামলা হয়েছে। সর্বশেষ যে ঘটনা ঘটেছে, তা অপ্রত্যাশিত। সম্পত্তি রক্ষা করতে হলে রেল মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের সঙ্গে কুকুর-বিড়ালের মতো আচরণ করবেন, এটি আমরা মানব না।
রেলের জিএমের বক্তব্য : পশ্চিম রেলের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সবাই প্রশ্ন করছেন, আমাদের মধ্যে সমস্যা কেন হচ্ছে। এই সমস্যা আর থাকবে না। আমরা রাবিতে যাব। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসব।
অবরোধ ও হামলায় ঘটনায় রোববার রাতে রাজশাহীর সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যাহত হলেও সোমবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, সোমবার সকাল থেকে রাজশাহী থেকে সব রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
যা বললেন উপউপাচার্য : রাবির উপউপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে, আলোচনা চলছে। কিন্তু এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তখন দৃষ্টান্তমূলত ব্যবস্থা নিলে হয়তো পরিস্থিতি এ পর্যায়ে আসত না।
