Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হচ্ছে অনুমতি

‘স্পর্শকাতর’ পদ্মা সেতু এলাকার বালু তোলায় তোড়জোড়

Advertisement

কাজী জেবেল

কাজী জেবেল

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘স্পর্শকাতর’ পদ্মা সেতু এলাকার বালু তোলায় তোড়জোড়

Advertisement

‘আইকনিক সোর্সিং’। পদ্মা নদী থেকে বালু তুলতে চাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান। আবেদনের প্যাডে ঠিকানা লেখা : ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড, ঢাকা। সরেজমিন অনেক খুঁজেও ওই ঠিকানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি এই নামও কেউ শোনেননি। প্যাডে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও সক্রিয় নয়। অথচ এমন এক প্রতিষ্ঠানকেই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পদ্মা সেতুর কাছাকাছি এলাকা থেকে ৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু তোলার অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে জোরেশোরে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে এলাকা থেকে বালু তোলার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, ঠিক সেখানেই নদীভাঙন রোধে ৫২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখান থেকে বালু তোলা হলে পদ্মা সেতুর নদীশাসন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আরও জানা যায়, এই বালু সরকারি কোনো প্রকল্পে ব্যবহার হবে কি না-এমন সুস্পষ্ট তথ্য প্রশাসনের কাছে নেই। মূলত বিক্রির জন্যই এই বালু তোলা হবে। সেই সুযোগ তৈরি করে দিতেই তড়িঘড়ি করে অনাপত্তি দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এমনকি ওই অনাপত্তির নথি অনুমোদন করতে রাতে সই করেন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। শুধু তা-ই নয়, অনাপত্তি বাতিল করতে প্রথমে চিঠি দিয়েছিল ভূমি মন্ত্রণালয়। পরে সেই মন্ত্রণালয়ই সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিকে বালু তোলার অনুমতি দেওয়ার সম্মতি জানিয়ে আরেকটি চিঠি দিয়েছে। এসব চিঠিতে কাটার সাকশান ড্রেজার ব্যবহার করে বালু তোলার শর্ত দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের ড্রেজার কোম্পানি হিসাবে বিআইডব্লিউটিএতে নিবন্ধিত নয়।

এদিকে বালু তোলার অনুমতি দেওয়ার জন্য কারিগরি কমিটি গঠন করে দিয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক। যদিও বালু তোলার নামে অপরিকল্পিত খননে নদীভাঙন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব ও মাছের প্রজনন সমস্যাসহ নানা আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। মুন্সীগঞ্জে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত এক বৈঠকে তারা এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ওই কারিগরি কমিটির প্রধান লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, কিছু বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। কমিটি কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। আমাদের ফাইন্ডিংস দিয়েছি। কী ধরনের সুপারিশ দিয়েছে, তা জানাতে রাজি হননি তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী বালুমহাল ঘোষণা করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারাদার নির্ধারণের বিধান রয়েছে। এ কার্যক্রম করেন স্থানীয় জেলা প্রশাসন। বেসরকারি কাউকে এভাবে বালু তোলার অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকারি কোনো প্রকল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কখনো কখনো অনুমতি দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী যুগান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বালু তোলার আবেদন করেছে। আমরা আইনিভাবে দেখছি অনুমোদন দেওয়া সম্ভব কি না। তবে এখনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। পদ্মা সেতু একটি কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা), নদীভাঙনপ্রবণতাও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত পাইনি। তাই এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।

বালু তোলা হলে পদ্মা সেতুর আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন ও জন-অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পদ্মা সেতু নির্মাণকাজে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন দুজন প্রকৌশলী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা যুগান্তরকে বলেন, নদীর বালু তুলে যারা ব্যবসা করে, তারা দেশীয় প্রযুক্তির ড্রেজার ব্যবহার করে। এতে একই স্থান থেকে বালু তোলায় গভীর খাদ তৈরি হয় এবং আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। এখানেও তা-ই ঘটবে, যা সরকারের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করবে।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখলাক উল জামিল ৯ সেপ্টেম্বর এক চিঠিতে জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর ভাটিতে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় নদীভাঙন রোধে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ড্রেজিংয়ের আওতায় থাকা চরটি এরই মধ্যে মরফোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট ইমেজেও নদীভাঙন সুস্পষ্ট। চিঠিতে পদ্মা সেতুর ভাটিতে ১৬ কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ হলেও ৯ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ওই প্রকল্প চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৬.৯ কিলোমিটার এলাকার নদীতীর সংরক্ষণে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সরকারদলীয় সংসদ-সদস্য আব্দুস সালাম আজাদ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার (চাহিদাপত্র) দিয়েছেন।

পাওয়া যায়নি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব : ৪ মে আইকনিক সোর্সিংয়ের প্রোপ্রাইটার সৈয়দ সাদাব মাহবুব বিআইডব্লিউটিএতে বালু তোলার আবেদন করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, পদ্মা সেতুর মূল ঠিকাদারের ক্রেন চলাচল ও পলি অপসারণের জন্য দেশীয় ড্রেজার দিয়ে চ্যানেল তৈরির অনুমোদন দিলে নিজস্ব অর্থায়নে কাজটি করবেন। এছাড়া ডিসি (জেলা প্রশাসক) অফিসের মাধ্যমে বালি/মাটির নির্ধারিত ফি সরকারকে দেবেন। তবে উত্তোলিত বালু কোথায় ব্যবহার হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির সাদামাটা প্যাডে অফিসের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড, ঢাকা। প্যাডে প্রতিষ্ঠানের সিল, ওয়েবসাইটের ঠিকানা বা কী ধরনের কাজ করে, তার কোনো উল্লেখ নেই। ফর্মে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ। সরেজমিন বছিলা রোডে গিয়ে ১১৫/১ নামের কোনো হোল্ডিং পাওয়া যায়নি। তবে ১১৫ নম্বর হোল্ডিংয়ে টিন দিয়ে তৈরি কয়েকটি ছোট মুদি, লাইব্রেরি, মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও চায়ের দোকান রয়েছে। সেখানকার হাফসা টেলিকমের মালিক মিয়া হোসেন জানান, ১১৫/১ নামে কোনো হোল্ডিং নেই। ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামও শোনেননি তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরকারি দপ্তরে অনুমোদনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সৈয়দ সাদাব মাহবুবের ভাই পরিচয় দেওয়া কাজী মো. লিয়াকত। তিন দিন যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাদাব মাহবুবের মোবাইল নম্বর বা প্রতিষ্ঠানের সঠিক ঠিকানা দিতে রাজি হননি। ভুয়া ঠিকানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, যেই মাধ্যমে আপনি তথ্য পাচ্ছেন, তারাই ভালো বলতে পারবে।

আইন লঙ্ঘন করে বিআইডব্লিউটিএ-এর অনাপত্তি : টেন্ডার ছাড়া বেসরকারি কাউকে বালু তুলতে দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। তবুও কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিকে বালু তোলার জন্য মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসককে অনাপত্তিপত্র দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এক্ষেত্রে সংস্থাটির কয়েক কর্মকর্তার অতি উৎসাহ দেখা গেছে। ১১ মে এই অনাপত্তি অনুমোদনের জন্য ই-নথিতে ফাইল তোলা হয় এবং ওইদিনই ছয়জন কর্মকর্তা সই করেন। এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত নন এমন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাত ৮টা ৩২ মিনিটে ফাইলে সই করেন এবং পরদিন তা মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। সবশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর দেওয়া দ্বিতীয় সার্ভে প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ পদ্মা সেতু থেকে ৩.৮৮ থেকে ৬ কিলোমিটার দূরত্বে লৌহজং থেকে মাগুখন্দ পর্যন্ত ১২৮.৪৪ একর জায়গা থেকে ৬ কোটি ৪০ লাখ ২৭ হাজার ঘনফুট বালু তোলার সম্মতি দিয়েছে।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে মোংলা বন্দরের চেয়ারম্যান) আরিফ আহমেদ মোস্তফা যুগান্তরকে বলেন, আমরা শুধু অনাপত্তি দিয়ে বলেছি জেলা প্রশাসন যথাযথ নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা কোনো অনুমোদন দিইনি।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের দুই ধরনের চিঠি : বিআইডব্লিউটিএ-এর অনাপত্তিপত্র বাতিল করতে ২১ জুন নৌসচিবকে চিঠি দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। চিঠিতে বলা হয়, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয় ছাড়া কারও অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার নেই। অথচ ১০ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় শর্তসাপেক্ষে ওই প্রতিষ্ঠানকে বালু তোলার প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়ে আরেকটি চিঠি দেয়।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, অনেক সময় আমাদের কাছে সরাসরি আবেদন এলে আমরা তা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়ে দিই। এই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে না জেনে মন্তব্য করতে পারব না।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম