Logo
Logo
×
   

Advertisement

প্রথম পাতা

রাজশাহী ও রংপুর

সারের ডিলার নিয়োগে তদবির-ঘুস বাণিজ্য

Advertisement

আনু মোস্তফা

আনু মোস্তফা

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সারের ডিলার নিয়োগে তদবির-ঘুস বাণিজ্য

Advertisement

সার সংকট সামাল দিতে প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় একজন করে নতুন সার ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এই নিয়োগ ঘিরে চলছে ঘুস ও তদবির বাণিজ্য। সরকারি নিয়মে ডিলারশিপের আবেদনের জন্য ফেরতযোগ্য জামানত মাত্র ১০ হাজার টাকা; কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের দিতে হচ্ছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। ঘুসের এই চক্রে জড়িয়ে পড়েছেন প্রশাসনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারীও। টাকার বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ ও অযোগ্য ব্যক্তিদের আবেদনও বৈধ হিসাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। রাজশাহীতে ডিলারশিপ বাগিয়ে নিতে মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতারা মন্ত্রণালয়ে জোর তদবির চালাচ্ছেন। রংপুরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের নামধারী নেতাদের বিরুদ্ধে তদবির ও ঘুস বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগ্য ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বদলে অর্থ ও রাজনৈতিক পরিচয়ে অনভিজ্ঞদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলে সার ব্যবস্থাপনায় চরম নৈরাজ্য তৈরি হবে এবং কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী-২ (মহানগর) আসনের সংসদ-সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, সার ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সঠিক নয়। আমি প্রশাসনকে আগেই বলেছি নীতিমালার আওতায় যোগ্য আবেদনকারীকে বিবেচনা করতে হবে। কোনো প্রভাব চলবে না। আর চূড়ান্তভাবে কৃষি মন্ত্রণালয় ডিলার নিয়োগের দায়িত্বে। তারা অধিকতর যোগ্য আবেদনকারীকেই ডিলারশিপের জন্য নির্বাচিত করবে।

বিএনপির রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সামু বলেন, আমাদের দলের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমি এখনো এমন অভিযোগ পাইনি। সরকারি নিয়ম মেনেই সার ডিলার নিয়োগ হবে। এতে কেউ দালালি করার জন্য টাকা নিলে লাভ হবে না।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সবুর আলী যুগান্তরকে বলেন, সারের নতুন ডিলার নিয়োগের আবেদন ফরমের মূল্য ২ হাজার টাকা। এটা অফেরতযোগ্য। এছাড়াও ফেরতযোগ্য ১০ হাজার টাকা জামানত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিয়মের বাইরে কোথাও কোনো অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়নি।

রাজশাহী : রাজশাহীর ৭৩টি ইউনিয়ন ও ১৪টি পৌরসভা এলাকায় নতুন ডিলারশিপের জন্য দুই হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। আবেদনকারীদের অধিকাংশই স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মী। যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ডিলারশিপ নিশ্চিত করতে মন্ত্রী-এমপিসহ এলাকার প্রভাবশালী নেতাদের কাছে ছোটাছুটি করছেন আবেদনকারীরা। মন্ত্রী-এমপিরাও নিজেদের কাছের লোকদের ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে মন্ত্রণালয়ে তদবির করছেন। কোথাও কোথাও বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনের অভিযোগও আসছে। চারঘাট ও বাঘায় তদবির হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আবেদনকারী বলেন, শুনেছি বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হচ্ছে। এভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হলে সার নিয়ে কৃষকদের যে দুর্গতি তা কোনোভাবেই কমবে না। প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মচারীরাও ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র বৈধ করার শর্তে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন।

এদিকে রাজশাহীতে বর্তমানে বিসিআইসি ও বিএডিসি মিলিয়ে মোট ২১৬ জন সার ডিলার রয়েছেন। নতুন নীতিমালায় প্রতিটি এলাকায় একজন করে ডিলার দেওয়ার পর বিদ্যমান ডিলারদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রাজশাহী জেলা সার ডিলার সমিতির সভাপতি রবিউল ইসলাম জানান, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকারে আছেন। পুরোপুরি অনভিজ্ঞরা ডিলারশিপ পেলে সুষ্ঠু সার বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সবুর আলী বলেন, উপজেলা কমিটির সরেজমিন প্রতিবেদনের আলোকে যোগ্য আবেদনকারীদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে জেলা কমিটির বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই। পুরোনো ডিলারদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, জেলা মনিটরিং কমিটি শুধু উপজেলা থেকে পাওয়া যোগ্য আবেদনকারীদের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এতে আমাদের কিছু করার নেই। মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করে একজনকে ডিলারশিপ দেবে।

রংপুর : জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ৮০ জন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। এর বিপরীতে প্রতিটির জন্য তিনজন করে মোট ২৪০ জনের নামের প্রাথমিক তালিকা ঢাকায় পাঠিয়েছে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আবেদনকারী জানান, শুধু প্রাথমিক তালিকায় নাম ঢোকাতেই জামানতের ১০ হাজার টাকার বাইরে ২ লাখ টাকা করে দিতে হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতের নামধারী নেতারা এই টাকা নিয়েছেন। এছাড়াও ঢাকায় কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবির করে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য আরও ১৪-১৬ লাখ টাকা করে দেওয়ার চুক্তি করছেন কেউ কেউ।

মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুরের কৃষক ময়নুল ইসলাম বলেন, আমরা সার সংকটে দিশেহারা। আশা ছিল নতুন ডিলার নিয়োগ হলে সংকট কমবে। কিন্তু নিয়োগের নামে যে ঘুস বাণিজ্য শুরু হয়েছে, তাতে সংকট কমার বদলে আরও বাড়বে।

অনিয়ম ও তদবিরের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ইসরাত জাহান বলেন, আমরা শুধু প্রতিটি এলাকা থেকে তিনজনের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে একজন করে নিয়োগ দেওয়া হবে। এখানে তদবির করে কোনো লাভ হবে না।

রংপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নিয়োগ নিয়ে কেউ কোথাও ঘুস বাণিজ্য করলে দায়দায়িত্ব তাদের। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামী রংপুর মহানগর কমিটির আমির এটিএম আজম খান যুগান্তরকে বলেন, শুধু রংপুর নয়, সারা দেশেই একই চিত্র। আমরা খবর পাচ্ছি। তবে জামায়াতে ইসলামী বা অঙ্গ সংগঠনের কেউ এই অর্থনৈতিক অনৈতিক লেনদেনে জড়িত নয়। যারা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম