ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
খোঁজা হচ্ছে মেরামতের পথ
ভারতের সঙ্গে বিষয়গুলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে দেখা হচ্ছে : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির * সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের দুই নেতা একসঙ্গে বসবেন : দীনেশ ত্রিবেদী
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তলানিতে যাওয়া ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। তবে দুদেশের সম্পর্ক আরও সক্রিয় ও কার্যকর করার প্রচেষ্টায় আছে সরকার। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের পদক্ষেপ নিয়ে সরকার গুরুত্ব সহকারে ভাবছে। অন্যদিকে ভারতের দিক থেকেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সাত মাসে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বিভিন্ন ইস্যুতে এখনো আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের দিক থেকে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত সুরক্ষা, বাণিজ্য ঘাটতির মতো ইস্যুগুলো আছে। তবে সরকারের এই একই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি ও বিভিন্ন খাতে সহযোগিতাও বেড়েছে। বোয়িং থেকে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করায় বাংলাদেশকে নিয়ে রীতিমতো ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশসহ ২০টি দেশ থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট বিশেষায়িত ওষুধ ও এর উপাদানে শুল্কছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে চীন সফর করেছেন। চীনের সঙ্গেও সহযেগিতা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। সরকারের বিভিন্ন সূত্র বলছে, এবার ভারতের সঙ্গে অবনমিত সম্পর্ক মেরামতের পথ খোঁজা হচ্ছে। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর একটি অবস্থা তৈরিতে সচেষ্ট দুই দেশ। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের পর ভারত বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট। সরকারের প্রভাবশালী একটি অংশ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য না থাকলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরের পর নতুন করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকের পর এই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন দুজনই। তবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া এবং কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও গণমাধ্যমকে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রগতির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এদিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পারস্পরিক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনুষ্ঠিত হবে। আমি খুবই আশাবাদী, আমরা শিগ্গিরই হয়তো ইতিবাচক ফল পাব।’ একই দিন যুগান্তরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করে শুরু থেকেই সরকার সব কূটনৈতিক, পররাষ্ট্র এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের সঙ্গে বিষয়গুলোও সেদিক থেকে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বুধবার সচিবালয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে নানা সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ থাকলেও দুদেশের প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে এমন কোনো প্রশ্ন থাকবে না, যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, উভয় পক্ষই এ বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তাদের নিজ নিজ টিমকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। দুটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের দুই নেতা একপর্যায়ে একসঙ্গে বসবেন। তিনি এ সময় আরও বলেন, দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো চ্যালেঞ্জ থাকবে না-এমনটি মনে করা ঠিক হবে না। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের বিষয়ে তিনি জোর দেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুদেশের মানুষের আগ্রহ হচ্ছে নেতাদের দেখা করা এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ অব্যাহত রাখা। পাশাপাশি খেলাধুলা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুদেশের মানুষের যোগাযোগ আরও বাড়ানো যায়। এছাড়া পানি, ক্রিকেট, ফুটবল, বাণিজ্য, কবিতা, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও গানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের যোগাযোগের কথাও এ সময় উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, ভারতের দিক থেকে সহযোগিতার প্রস্তাব থাকায় উভয় দেশেরই বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক আলোচনা করা উচিত। তিনি আলোচনার সময় নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা বা সংবেদনশীল বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং এজেন্ডা উন্মুক্ত রাখার প্রতি গুরুত্ব দেন।
এই কূটনীতিক বলেন, কূটনীতির ভাষায় বললে, সব পক্ষই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে, যা সম্পর্ক মেরামতের পথকে সুগম করবে। তাই নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের ওপর জোর না দিয়ে সামগ্রিক ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পন্থা বের করতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, জাতিসংঘ অধিবেশনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারত সফর নিয়ে কিছুটা তৎপরতা দেখাচ্ছে। যেহেতু ভারতের বিশাল বাজারের কারণে এই সম্পর্ক থেকে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হতে পারে, তাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করতে বাংলাদেশকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, তবে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে গঙ্গা পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ঘাটতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় দৃশ্যমান প্রাথমিক প্রস্তুতি বা আলোচনা থাকা জরুরি, যা মূল আলোচনায় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহযোগিতা করবে। এছাড়া ভবিষ্যতে উত্তেজনা এড়াতে ভারতীয় রাজ্য সরকারগুলোর বিভিন্ন মহল থেকে যেন বাংলাদেশ বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য না করে, সেজন্য দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

