ভয়ের বদলে তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি চালু
নিয়ন্ত্রণে আসছেই না আইনশৃঙ্খলা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে দেশে এক ধরনের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ চালু ছিল। বলা হতো, বাংলাদেশ একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে উলটো পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ পুলিশকে কেউ ভয় পায় না এমন আলোচনা এখন জনমনে চালু হয়েছে। ফলে শত শত অপরাধীকে গ্রেফতার করা হলেও কেন জানি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অনেকের মতে, ভয়ের সংস্কৃতির বদলে তোয়াক্কা না করার (ড্যাম কেয়ার) সংস্কৃতি চালু হয়েছে। ফলে পুলিশ দেখলে পালানোর পরিবর্তে অনেক জায়গায় পুলিশই হামলার শিকার হচ্ছে।
সর্বশেষ বুধবারও মিরপুরে ফুটপাতে হকার উচ্ছেদের ঘটনায় পুলিশের গাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। ওই ঘটনায় মিরপুর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আগুন দেওয়া হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকটি গাড়িতে। ভাঙচুর করা হয় উচ্ছেদ কাজে ব্যবহৃত এক্সকেভেটর (ভেকু) এবং পুলিশের গাড়ি। অনেকের মতে, অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রতিনিয়তই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার এমন চিত্রকে চরম উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মিরপুরের ঘটনার আগে বৃহস্পতিবার রাতে ‘রাড্ডা ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারে’ অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু তাই নয়; ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একজন সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলমান রয়েছে। এর একদিন পরে শনিবার রাতে ইসিবি চত্বরসংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি প্রপার্টিজে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুরসহ সেখানে তাণ্ডব চলে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ এ ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় ৭ জনকে। এছাড়া মোহাম্মদপুরে জমি দখলের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র মব হামলা, আদাবরে আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টা, ২৫ মামলার আসামি শীর্ষ মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’র প্রিজন ভ্যান থেকে পলায়ন এবং চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সংঘর্ষসহ বেশকিছু ঘটনা গত কয়েকদিনে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়। এসব ঘটনা সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকারের তরফ থেকে ব্যাপক তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। বুধবার একদিনেই বিভিন্ন অভিযোগে রাজধানী থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে চার শতাধিক অপরাধীকে।
সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সচিবালয়ে বলেন, এসব হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনায় সরকার চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী চরম অস্থিতিশীল বা নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি থেকে দেশ এখন অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে অত্যন্ত কঠিন এক অবস্থার মধ্য দিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কিছু অপরাধ বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে কমেছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে যাদের অপরাধ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধেই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশ বাহিনীতে চরম বিপর্যয় তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলে। কিন্তু সেই অর্থে আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দেন, দেশে আর মব সন্ত্রাস থাকবে না। পরিস্থিতি দ্রুতই উন্নতি হবে। সে লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার ও জনবান্ধব হিসাবে গড়ে তোলার জন্য নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়। চলমান রয়েছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাং দমনে সাঁড়াশি অভিযান। প্রতিনিয়ত গ্রেফতার করা হচ্ছে শত শত অপরাধীকে। পুলিশ সদর দপ্তরে ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে মনিটরিং টিম। কিন্তু বাস্তবে এসবের সুফল মিলছে না। কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। একের পর এক নৃশংস ও বিশৃঙ্খল ঘটনায় জনমনে তীব্র আতঙ্ক, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে সার্বিক দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিচার করা ঠিক হবে না। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ৯৯৯-এ ফোন পাওয়া মাত্রই পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল যাচ্ছে। দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতার করছে। সুতরাং, সরকারের কোনো দায়ভার বা ব্যর্থতা নেই। তিনি বলেন, সরকার বা পুলিশের ব্যর্থতা তখনই বলা যেত যদি আমরা ব্যবস্থা না নিতাম। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়মিত গ্রেফতার করা হচ্ছে। সামনে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘দুর্বৃত্ত দুর্বৃত্তই, তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশ গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করেছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী পুলিশি তৎপরতা চলছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের সহযোগিতা নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তবে গত কয়েকদিনের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করলে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয় বর্ডার গার্ড হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে তার নৃশংস ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, অপরাধীরা নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ কাজ করছে। সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তারা বলেন, প্রভাবশালী মহল কিংবা ক্ষমতাসীনদের মদদ ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম সম্ভব নয়। তাই অপরাধীদের দমনে শুধু গ্রেফতারই যথেষ্ট নয়, সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। যা দেখে বাকি অপরাধীরা ভীত হয়। তারা মনে করেন, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, জনমনে স্বস্তি ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়বে। এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধী বা সন্ত্রাসীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দেখা যাবে না। তাদের পেছনে যেসব মদদদাতা রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীর মনোবল ও প্রশাসনিক কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা নীতি প্রয়োগ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অতীতে অপরাধীরা আইন এবং পুলিশের প্রতি যে ভয় পেত, বর্তমানে সেই ভয়ের সংস্কৃতি পুরোপুরি অনুপস্থিত। যে কারণে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, অপরাধী গ্রেফতারের খবর স্বস্তিদায়ক হলেও অপরাধের মূল শিকড়ে টান দিতে না পারলে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধীরা যখন দেখে যে, তাদের পেছনে কোনো না কোনো প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক চক্রের অদৃশ্য হাত রয়েছে, তখন আইনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে না। অপরাধী যেই হোক না কেন, রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে এক সময় সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

