Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

উচ্ছেদ নিয়ে রণক্ষেত্র মিরপুর

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন ও মিরপুর (ঢাকা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্ছেদ নিয়ে রণক্ষেত্র মিরপুর

রাজধানীর মিরপুরে বুধবার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানকালে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় -যুগান্তর

Advertisement

রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে হকারদের। বুধবার সকালে মিরপুর-১০ নম্বরে হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে উচ্ছেদ শুরু হলে পালটাপালটি হামলায় মিরপুর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন হকাররা। পুলিশ সদস্য এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও তাদের হামলার শিকার হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে।

ঘটনার সময় বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে লাগা আগুনে হোপ গলির ৫টি দোকান পুড়ে যায়। একপর্যায়ে বায়তুল কুদ্দুস মসজিদে আগুন লেগেছে-এমন গুজব ছড়িয়ে মানুষকে খেপিয়ে অভিযানকারীদের ওপর হামলা করা হয়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ অভিমুখী সড়কসহ আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে তারা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ২৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মিরপুর মডেল ও কাফরুল থানায় ৪টি মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।

এদিকে ঘটনার পর ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ঘোষণা করেন, হামলা ও বাধার কারণে ফুটপাত উদ্ধার অভিযান বন্ধ হবে না। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রাথমিক তথ্যে অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে মনে হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নিজের সংসদীয় আসনে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর আগে তাকে কিছু না জানানোয় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

ডিএনসিসি, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে অভিযান শুরু হয়। হোপ মার্কেটের সামনে দোকান সরানোর সময় উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে হকারদের একটি অংশ লাঠি ও ইটপাটকেল নিয়ে অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযান শুরুর পর হোপের গলির মুখে মসজিদ মার্কেটের দোকানগুলোর দখলে থাকা প্রধান সড়কের ফুটপাতের অংশ ভেকু মেশিন দিয়ে উচ্ছেদ করার সময় শর্ট সার্কিটে মসজিদ মার্কেটের ভেতরে আগুন ধরে যায়। এতে নিচতলার ৫টি দোকান পুড়ে যায়। দোকানগুলো ৩০ হাজার টাকা করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, মসজিদের নিচের দোকানে আগুন লাগলেও ‘মসজিদে আগুন লেগেছে’-এমন গুজব ছড়িয়ে হকাররা ৩টি ময়লার গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেয়। ভাঙচুর করা হয় ভেকু মেশিন ও পুলিশের গাড়ি। সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। যমুনা টেলিভিশনসহ একাধিক গণমাধ্যমের গাড়িতে হামলা এবং সংবাদকর্মীদের মারধর করা হয়। শুরুতে হকারদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পুলিশ ও ডিএনসিসির উচ্ছেদকারী দল পিছু হটে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। হকাররা বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় অনেক পথচারী আহত হন। হামলার ভিডিও ধারণ করায় অনেকের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন হকাররা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। একপর্যায়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও উচ্ছেদ অভিযান সফল করতে এগিয়ে আসেন। এ সময় দুদিক থেকে পুলিশ হকারদের ঘিরে ফেললে তারা মূল সড়ক ছাড়তে বাধ্য হন। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন লাগার কয়েক মিনিট পরই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের দুটি গাড়ি গিয়ে কাজ শুরু করে। ১৫-২০ মিনিটের চেষ্টায় তারা আগুন নেভাতে সক্ষম হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩-১৪ নম্বরমুখী সড়কে মিরপুর আইডিয়াল স্কুলসংলগ্ন হোপ মার্কেটের

কয়েকটি কাপড়ের দোকান, জুতা-স্যান্ডেল ও কসমেটিক্সের দোকান পুড়ে গেছে। রাস্তার দুপাশের সড়ক ও ফুটপাথে বাঁশ কাঠ এবং প্রধান সড়কজুড়ে ভাঙচুর হওয়া কাচ ও ইটের টুকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পুড়িয়ে দেওয়া সিটি করপোরেশনের একটি গাড়িও দেখা যায়। দুপুর ১টার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে যান চলাচল শুরু হয়। দুপুর ২টার পর দ্বিতীয় দফায় আশপাশের কয়েকটি সড়কে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। বেলা ৩টার পর অভিযান স্থগিত করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় উচ্ছেদকারী দল। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় তিনটি এবং কাফরুলে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় একটিসহ চারটি মামলা করা হচ্ছে। একটা পুলিশের ওপর হামলা-ভাঙচুর, আরেকটা ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর এবং তৃতীয়টি সিটি করপোরেশন বাদী হয়ে করেছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে জড়িতদের এসব মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে।

জড়িতদের গ্রেফতারসহ অভিযান অব্যাহতের ঘোষণা প্রশাসকের : সংঘর্ষ চলাকালে ঘটনাস্থলে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন সাংবাদিকদের বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিতে ফুটপাত উদ্ধার কার্যক্রম চলবে। হামলায় পুলিশের পাশাপাশি ডিএনসিসিও মামলা করবে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্ধার করা ফুটপাত আবার দখল কিংবা দখলে ইন্ধন দেওয়ার চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হামলাকে পরিকল্পিত উল্লেখ করে প্রশাসক এর জন্য ‘ফ্যাসিজমের দোসরদের’ দায়ী করেন। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ফুটপাত দখল করে থাকা ব্যক্তি এবং তাদের ইন্ধনদাতারা সিটি করপোরেশনের যানবাহন, সাংবাদিক ও পুলিশের ওপর হামলা করেছেন। হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সমন্বয়ের ঘাটতি তদন্তের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর : সচিবালয়ে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ সম্পন্ন করেননি। সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে মনে হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করতে বলা হয়েছে।

উচ্ছেদের বিষয় না জানানোয় ‘বিস্মিত’ জামায়াত আমির : নিজের সংসদীয় আসনে এই অভিযান চালানোর আগে তাকে কিছুই জানানো হয়নি বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ-সদস্য জানান, তার নিজের সংসদীয় আসনে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর আগে তাকে অবহিত না করার বিষয়টি তাকে বিস্মিত করেছে। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমারও দায়িত্ব রয়েছে এবং আমাকে সম্পৃক্ত করা যেত। পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে একটি উত্তম ও কার্যকর পথ বের করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই পথ অনুসরণ করা হয়নি।’ স্থানীয় এ সংসদ সদস্য বলেন, ‘মাসের পর মাস একদল অসাধু ও চাঁদাবাজ ব্যক্তি এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা নিয়ে তাদের ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে। এর আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতা ও জনগণের ওপর পড়ে। বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য কল্যাণকর সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও টেকসই পদক্ষেপ প্রয়োজন।’ পোস্টের শেষে ‘ফ্যাসিবাদের দোসরদের কোনো জায়গা নেই’ এমন মন্তব্য করেন।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ভয়ের বদলে তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি চালু নিয়ন্ত্রণে আসছেই না আইনশৃঙ্খলা

নিয়ন্ত্রণে আসছেই না আইনশৃঙ্খলা

উচ্ছেদ নিয়ে রণক্ষেত্র মিরপুর

উচ্ছেদ নিয়ে রণক্ষেত্র মিরপুর

প্রবেশ পাশ নিয়ে যাচ্ছে তাই অবস্থা অরক্ষিত সচিবালয়, শঙ্কা নিরাপত্তা নিয়ে

অরক্ষিত সচিবালয়, শঙ্কা নিরাপত্তা নিয়ে

সংবাদ সম্মেলনে মাহ্দী আমিন আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতীয় স্বার্থকে অটুট রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতীয় স্বার্থকে অটুট রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম