কানাডায় নূর ইসলাম পরিবারের সন্দেহজনক লেনদেন
এপ্রিলে পরিবারসংশ্লিষ্ট ৯ জনের কর ফাঁকির অনুসন্ধান শুরু করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর মদ ব্যবসায়ী শেখ নূর ইসলাম ও তার পরিবারের তিন সদস্যের নামে কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে ৪৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট নূর ইসলাম পরিবারসংশ্লিষ্ট নয়জনের কর ফাঁকির অনুসন্ধান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমের সঙ্গে তার শ্বশুরের পরিবারের কর ফাঁকির অনুসন্ধানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এটি সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের নিয়মিত কার্যক্রম। ২০ জুন নূর ইসলামের পরিবারের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর আগে এপ্রিলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্র জানায়, নূর ইসলামের আয়কর নথিতে অসংগতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিনি রেমিট্যান্স হিসাবে ৯৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা দেশে আনেন। তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ১০৪ কোটি টাকা এবং এর বিপরীতে আয়কর দেন ৬৯ লাখ টাকা। এর আগের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সম্পদ দেখিয়েছিলেন ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং কর দিয়েছিলেন ৫ কোটি টাকা। আয়কর আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশি করদাতাদের বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ রিটার্নে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। দেশে মোট সম্পদের পরিমাণ কম হলেও যদি কারও বিদেশে কোনো সম্পদ থাকে, তবে তা রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বিদেশের সম্পদ রিটার্নে গোপন করলে সম্পত্তির ন্যায্য বাজারমূল্যের সমপরিমাণ জরিমানার বিধান রয়েছে। বকেয়া জরিমানা আদায়ে কর কর্তৃপক্ষ দেশে বা বিদেশে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রোক, বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি করতে পারে। এনবিআর প্রয়োজনে দেশে-বিদেশে তদন্ত ও তথ্য উদ্ধারের আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।
আয়কর নথির তথ্য অনুযায়ী, নূর ইসলাম বাংলাদেশে ১৪টি কোম্পানির পরিচালক। এর মধ্যে রয়েছে ডমিনোজ পিজা, ফুওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, এসআই ট্রাভেলস অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, টাভার্স সাপ্লায়ার্স, রেডিও মাসালা, পল বেকারি অ্যান্ড ক্যাফে রেস্টুরেন্ট, ডমিনাস অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, স্পাইস টেলিভিশন, কয়লা পাব, স্টারবার ক্যাফে, ফুওয়াং ডমিনোজ প্রোপার্টিজ, স্পাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং টিম হর্টনস লিমিটেড। কৃষি খাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের কানাডার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৫ মিলিয়নের বেশি কানাডিয়ান ডলারের লেনদেন হয়েছে। এ সময়ে ১৬৫টি বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট, দুটি ব্যর্থ বা চেষ্টা করা সন্দেহজনক লেনদেন, ১১৮টি বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং দুটি ক্রস-বর্ডার কারেন্সি রিপোর্ট রয়েছে। এসব লেনদেনে কানাডিয়ান ডলারের পাশাপাশি ব্রিটিশ পাউন্ড, মার্কিন ডলার, সিঙ্গাপুরি ডলার ও থাই বাথ ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।
কানাডায়ও ব্যবসা রয়েছে নূর ইসলামের। তিনি কানাডার ‘জুম জুম পিজা’র স্বত্বাধিকারী এবং স্ত্রী শিলা ইসলাম ‘ডমিনোজ পিজা’ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের মেয়ে দিশা ইসলাম সান লাইফের ইনভেস্টমেন্ট কনসালটেন্ট এবং তাসনিম ইসলাম ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসাবে নিবন্ধিত। বাংলাদেশে কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজ টস বন্ডের পরিচালক হিসাবেও শেখ নূর ইসলাম, শিলা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নাম রয়েছে।
সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, নূর ইসলাম পরিবারের সদস্যরা কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে যৌথ ও একক নামে একাধিক হিসাব পরিচালনা করেন। দ্য টরন্টো-ডোমিনিয়ন ব্যাংকে শেখ নূর ইসলাম, শিলা ইসলাম ও দিশা ইসলামের একটি যৌথ ব্যক্তিগত হিসাব রয়েছে। ব্যাংক অব মন্ট্রিলে শিলা ইসলাম ও দিশা ইসলামের যৌথ হিসাব এবং শিলা ইসলাম এবং তাসনিম ইসলামের একাধিক যৌথ হিসাব সক্রিয়। এছাড়া টিডি ব্যাংকে দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামে যৌথ হিসাব পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে হোম ট্রাস্ট কোম্পানিতে শিলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাব নথিভুক্ত পাওয়া গেছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও কানাডার নাগরিকত্ব ও স্থাবর সম্পদের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করেননি নূর ইসলাম। কানাডায় অর্থ স্থানান্তরের দলিলও রিটার্নে সংযুক্ত করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকও অর্থ স্থানান্তরের তথ্য দিতে পারেনি বলে কর্মকর্তারা জানান। প্রাপ্ত দলিলাদি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশ থেকে অর্থ পাচারের মাধ্যমে কানাডায় আলিশান সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। ব্যাংক হিসাবের তথ্যপ্রাপ্তির পর অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
