রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ভাঙচুর দখলচেষ্টা
সংসদ-সদস্য পদও গেল মিষ্টির
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার ঘটনায় দলীয় পদের পর এবার সংসদ-সদস্য (এমপি) পদও হারালেন বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশের পর বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। স্পিকার তা গ্রহণ করে তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও সিসিটিভি ফুটেজে স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলচেষ্টার নেপথ্যে মিষ্টি ও তার অনুসারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ায় সরকার ও দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
একাধিক সূত্র জানায়, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় মিষ্টিসহ জড়িতদের নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও দলীয় গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার আইনি পদক্ষেপও নিচ্ছে। রাড্ডা কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রধান আসামি স্থানীয় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মিষ্টির পদত্যাগের বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের (২৩ নম্বর) সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগপত্র পাওয়ার পরপরই তার পদ শূন্য হয়ে গেছে। আমরা এটি নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দেব। আজ থেকেই এই পদত্যাগ কার্যকর হবে।
পরে সংসদ সচিবালয়ও বিষয়টি নিশ্চিত করে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংসদ ভবনে স্পিকারের দপ্তরে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। স্পিকারের দপ্তর থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তে যা আসবে, সেটাই হবে। বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দুই দশকের জমির বিরোধের জের : রাড্ডা কেলেঙ্কারির শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় প্রায় দুই দশক আগে। মিরপুর-১ নম্বরের ওই ১০ কাঠা জমির মূল মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। সত্তরের দশক থেকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার সেখানে দরিদ্র মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। কিন্তু জমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সঙ্গে তাদের বিরোধ চলছিল।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। সে সময় রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। পরে বিরোধটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। গোয়েন্দা তদন্তে উঠে আসে, ওই সমিতির কার্যক্রমে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হানিফ মিয়া ও মোস্তফা জগলুল পাশাসহ স্থানীয় কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর রাতের তাণ্ডব : গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটে। দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে দুই শতাধিক ব্যক্তি ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। একটি টিনশেড ও তিনটি আধাপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। লুট করা হয় আসবাব, ওষুধ, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, এসি ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী। হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। রাড্ডা কর্তৃপক্ষের হিসাবে এই তাণ্ডবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। ঘটনার পর শাহ আলী থানায় হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত স্থানীয় নেতারা : তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গোয়েন্দা তথ্য ও পুলিশি তদন্তে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হানিফ মিয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা এবং শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ লেলিনের নাম উঠে আসে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলার আগে কয়েকজন নেতার কার্যালয়ের আশপাশে হামলাকারীরা জড়ো হয় এবং হামলার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
শুরুতে অস্বীকার, পরে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা : ঘটনার পরপরই বিএনপি নেতারা সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন। মিষ্টিও দাবি করেন সমমনা সমিতির সঙ্গে তার বর্তমানে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু পুলিশি তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য সামনে আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করে বিএনপি। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মিষ্টির নাম : রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও এই তাণ্ডবের নেপথ্যে মিষ্টি ও তার অনুসারীদের নাম উঠে আসে। শাহ আলী থানার ওসি মো. রাজিব হোসেন যুগান্তরকে জানান, মামলার এজাহারনামীয় প্রধান আসামি মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে থানা-পুলিশ ও ডিবির একাধিক টিম কাজ করছে। এর আগে এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার তৎকালীন ওসি জাহাঙ্গীর আলমকেও প্রত্যাহার করা হয়। ফলে রাড্ডাকাণ্ডে শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রশাসনিক পর্যায়েও দায়দায়িত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
দেশে ফিরেই রাড্ডা হাসপাতালে সেলিম উদ্দিন : দেশে ফিরেই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা হাসপাতালে গেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির ও ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদপ্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। বিদেশে অবস্থানকালেই তিনি হামলার খবর পান। বৃহস্পতিবার দুপুরে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি রাড্ডা হাসপাতালে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করেন। পরে তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।
