ফেনীতে সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
কিছু দল অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে
ফেনী প্রতিনিধি ও বাসস
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফেনীর পরশুরাম উপজেলার ‘মুহুরি-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্প উদ্বোধন শেষে বৃহস্পতিবার আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ ২০ কোটি মানুষের দেশ। এখানে ভালো-মন্দ সব ধরনের মানুষ আছে। কিন্তু দেশের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। এতে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হলে তার দায়ভারও তাদের নিতে হবে। বিএনপি সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় ধ্বংসকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে পর্যায়ক্রমে। ১৭ বছর ধরে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। সর্বশক্তি দিয়ে বিএনপি আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।
ফেনীর পরশুরামের ঘাটঘর মুহুরী ব্রিজ এলাকায় ‘মুহুরি-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন’ উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। এর আগে ফেনী পৌঁছে বেলা আড়াইটায় সেচ প্রকল্প উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী এবং ফেনী-৩ আসনের সংসদ-সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফেনী-১ আসনের সংসদ-সদস্য মুন্সী রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ-সদস্য জয়নাল আবদীন ও সংসদ-সদস্য রেহানা আক্তার রানুসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি গুপ্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা আমাদের নসিহত করছে। তাদের বলব, আগে নিজের ঘরের দিকে নজর দিন। তাদের কিছু সদস্য নারীদের ওপর নির্যাতন করছে। এ নিয়ে তদন্ত চলছে। তাই আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে মানুষ বলে, তাদের এক নেতা শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হননি। একটা মানুষের জীবনাবসান করে দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মানুষকে বিভ্রান্ত করে কিছু আসনে জিতেছে। এরপর ধরাকে সরাজ্ঞান করছে। ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা কী ছিল, কীভাবে তারা মা-বোনকে নির্যাতন করেছে, তা সবাই জানে। তারা এখন আবার অরাজকতা ও নারী নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ দেশের জনগণ যখন বিএনপি সরকারের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তখন সরকার তার সর্বশক্তি দিয়ে ইনশাআল্লাহ সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের জন্য নেওয়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল ও নদী খনন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ এবং বন্ধ মিল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব কাজে যদি বাধা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে ক্ষতি কার হবে? এ দেশের জনগণেরই ক্ষতি হবে।’ প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১৫০-এ উন্নীত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রসারিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ডায়ালাইসিস সেবা এবং মা ও শিশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। অতিরিক্ত ১০০টি শয্যা যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন বিভাগও চালু করা হবে। পরশুরামের ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে হাসপাতালটির প্রথম ৩০টি শয্যা স্থাপন করা হয় এবং পরে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে ৫০-এ উন্নীত করা হয়। হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি তার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে তিনি এর পরিবর্তে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১৫০-এ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মধ্যম আয়ের কৃষকদের সরাসরি সরকারি সহায়তার আওতায় আনতে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা দূর করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার ইতোমধ্যে সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছেন। এতে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রায় ১৩ লাখ কৃষক এ সুবিধা পেয়েছেন।
মুহুরি-কহুয়া প্রকল্প প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তার বৃহত্তর খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসাবে মুহুরি ও কহুয়া নদীর সংযোগকারী খালটি পুনঃখননের কাজ শুরু করেছে। এ সময় তিনি ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা স্মরণ করে বলেন, সে সময় ফেনীতে সেতুর ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল এবং নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের বাড়িঘরও পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকার প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছবে। উৎপাদন আনুমানিক ১ লাখ মেট্রিক টন বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এই খাল ও নদী পুনঃখনন কর্মসূচিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসাবে উল্লেখ করেন। গত ১৭ বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল ও কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার জন্য সরকার কাজ করছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, এই মিল ও কারখানাগুলো চালু হলে ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কর্মসংস্থান বাড়লে ধীরে ধীরে পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে, মানুষ আরও স্বনির্ভর হবে এবং তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং সেই ম্যান্ডেটের ভিত্তিতেই সরকার তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিএনপি শুরুতে যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, সেগুলো এখন জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে এবং তিনি এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। এগুলো এখন আর শুধু বিএনপির কর্মসূচি নয়। এগুলো এখন জনগণের কর্মসূচি।
ফুলগাজীতে ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ড বিতরণ উদ্বোধন : বিকালে ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। ফুলগাজীর ২৩৮ জন ইমাম-মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতকে সম্মানি ভাতা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজীর ২০০ দরিদ্র, অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থী এবং প্রতিবন্ধীর মাঝে অনুদান ও ঢেউটিন বিতরণ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুলগাজীর বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ ও রুফটপ সোলার থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। জানা গেছে, ফুলগাজীতে মোট ৫১০ জনকে ফ্যামিলি কার্ড, জেলার ছয় উপজেলার ৭ হাজার ৬৪৩ জনকে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাকি কার্ড বিতরণ করা হবে।
মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা : এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা ও অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার বিভিন্ন অংশে হাজারো নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। দাউদকান্দির মেঘনা-গোমতী টোল প্লাজায় রীতিমতো মানুষের ঢল নামে। গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড ও ইলিয়টগঞ্জ থেকে শুরু করে মহাসড়কের গজারিয়া অংশসহ বিভিন্ন স্থানে দুই পাশে দাঁড়িয়ে অসংখ্য নেতাকর্মীকে হাত নেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে।
