শান্তির নোবেল পেলেন গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার পিল্লাই
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ও গাজায় ইসরাইলের চালানো গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার দক্ষিণ আফ্রিকার আইন বিশেষজ্ঞ নাভি পিল্লাই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত পিল্লাই ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনসিএইচআর) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার রক্ষায় তার দীর্ঘদিনের অবদানের কথা স্বীকার করে তাকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নোবেল কমিটি এ পুরস্কার ঘোষণা করে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, মানবাধিকার রক্ষা ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন পিল্লাই। গত বছর গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনেরও নেতৃত্ব দেন এ বিচারক। এ অর্জন প্রসঙ্গে জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউএনসিএইচআর-এর মুখপাত্র শাবিয়া মান্টু বলেন, ‘এটি চমৎকার একটি খবর; মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি নিষ্ঠা ও অঙ্গীকার প্রয়োজন।’
৮৫ বছর বয়সি নাভি পিল্লাই ২০২১ সালে ইসরাইল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘটিত ‘পদ্ধতিগত’ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতিসংঘের উন্মুক্ত তদন্ত প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে আল-জাজিরাকে তিনি জানান, জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের হয়ে তার দল ইসরাইল ও হামাসের সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে ৭ হাজারেরও বেশি প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জমা দিয়েছে। গাজায় ইসরাইলি নৃশংসতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এর আগে এমন কিছু কখনো দেখিনি।’
এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ২৮৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। সবাইকে পেছনে ফেলে পুরস্কার জেতেন পিল্লাই। তার জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন নাটাল প্রদেশের ডারবানের ক্লেয়ারউড এলাকায়। বাবা ছিলেন বাসচালক। বর্ণবাদী শাসনামলে আট ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। শৈশবেই বর্ণবৈষম্যের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। পরে আইনজীবী হিসাবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের পাশে দাঁড়ান।
১৯৯৫ সালে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসাবে দায়িত্ব নেন নাভি পিল্লাই। ১৯৯৯ সালে তিনি এ ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হন। রুয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনায় জঁ-পল আকায়েসুর বিচার চলাকালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন পিল্লাই। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত একটি মামলাতেও তিনি যুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের (সিওআই) নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নাভি পিল্লাই।
পুরস্কার ঘোষণায় নোবেল কমিটি বলছে, আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবস্থা এখন প্রচণ্ড চাপে। এর প্রতিষ্ঠানগুলোও আক্রমণের শিকার। এমন সময়ে পিল্লাইকে সম্মানিত করা হচ্ছে। পুরস্কার পাওয়ায় নাভি পিল্লাইকে অভিনন্দন জানান ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি পিল্লাইকে ‘ক্ষমতার জোরের চেয়ে আইনের শাসনের পক্ষে’ সোচ্চার ব্যক্তি হিসাবে অভিহিত করেন।
ট্রাম্পকে নিয়ে রসিকতা
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবরের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে রসিকতা করেন পিল্লাই। ট্রাম্প নিজেও দীর্ঘদিন ধরে এ পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। জার্মানির নুরেমবার্গে পুরস্কার ঘোষণার পর পিল্লাইকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানো হচ্ছিল। সে সময় তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আরও একটু বেশি হাততালি দেন, তাহলে হয়তো এ পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেব।’ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড ও মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন। পরে তিনি ভিডিওটি সামাজিকমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেন। পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
নোবেল কমিটির পুরস্কার দেওয়ার যুক্তি ১৯০১ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, শুরুতে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পেতে থাকে। শীতল যুদ্ধের সময় এ প্রবণতা আরও জোরালো হয়।
নোবেল শান্তি পুরস্কার হিসাবে নাভি পিল্লাই একটি স্বর্ণপদক ও সনদের সঙ্গে পাবেন ১২ লাখ ডলার (বাংলাদেশ মুদ্রায় প্রায় ১৪ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা)। আগামী ১০ ডিসেম্বর অসলোতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তক সুইডিশ উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুবার্ষিকীতেই প্রতিবছর এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
