নন্দনগাছীতে রেলের ৩০ একর ভূমি
মাছ চাষে লিজ নিয়ে ভরাট করে দোকান বাণিজ্য
মার্কেট নির্মাণ ও প্লট বিক্রি করে হাতিয়েছেন কোটি টাকা * প্রভাবশালী মহল তুলছে মোটা অঙ্কের ভাড়া * স্টেশন এলাকায় জলাবদ্ধতা, অসন্তোষ
Advertisement
তানজিমুল হক, রাজশাহী
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহীর চারঘাটের নন্দনগাছী রেলস্টেশনে রেলের জমি দখল করে দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দীর্ঘ সাড়ে আট বছর বন্ধ থাকার পর আগস্টে চালু হয়েছে রাজশাহীর চারঘাটের নন্দনগাছী রেলস্টেশন। তবে স্টেশন চালুর পরও রেলের জমি দখল থামেনি। স্টেশনসংলগ্ন প্রায় ৩০ একর জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় চারশ দোকান ও নানা স্থাপনা। অধিকাংশেরই নেই অনুমোদন। এসব দোকান থেকে প্রতিমাসে মোটা অঙ্কের ভাড়া তুলছেন প্রভাবশালী দখলদাররা।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থক রফিকুল ইসলাম মাছ চাষের জন্য রেলের একটি জলাশয় লিজ নিয়ে রাতের আঁধারে এর বড় অংশ ভরাট করেছেন। সেখানে বাণিজ্যিক অনুমোদন না নিয়েই মার্কেট নির্মাণ করে ১০টি দোকান বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি জলাশয়ের জমি প্লট আকারেও বিক্রি করছেন তিনি। ইতোমধ্যে এতে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নন্দনগাছী বাজার ও স্টেশন এলাকার পানি নিষ্কাশনে জলাশয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভরাটের কারণে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে বর্ষা মৌসুমে স্টেশন ও বাজার এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষা শেষ হলেও পানি নামছে না। এতে বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
নিমতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, প্রতি বছর বর্ষায় স্টেশনসংলগ্ন এলাকা পানিতে ডুবে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে গত বছর কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে জলাশয়টি সংস্কার করা হলেও মাছ চাষের জন্য লিজ নিয়ে রাতের আঁধারে তা ভরাট করে মার্কেট করা হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেও ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, রফিকুল মাছচাষের জন্য জলাশয়টি লিজ নিয়েছেন। বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন না থাকলেও জলাশয় ভরাট করে দোকান নির্মাণ ও বিক্রি করছেন। স্থানীয়রা বাধা দিলে ক্ষমতার প্রভাব দেখানো হচ্ছে।
জলাশয়ের জমিতে দোকানের জন্য রফিকুলকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী। তার দাবি, তার মতো অনেকেই টাকা দিয়ে জায়গা নিয়েছেন।
রফিকুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি ৪৫ শতক জমি মাছচাষের জন্য লিজ নিয়েছিলাম। পরে মার্কেট নির্মাণে রেল কর্তৃপক্ষের বাণিজ্যিক অনুমোদন নিয়েছে। এর কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়নি। তার দাবি, অন্যরা আগে জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তবে তিনি মার্কেট নির্মাণ করে দোকান বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন।
রফিকুলের বাবা মোজাহার মণ্ডল নিমতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। রফিকুল নিজেও পরিবারের আওয়ামী লীগ সমর্থনের কথা স্বীকার করেছেন; তবে তার কোনো পদ-পদবি নেই।
স্টেশনের উত্তর পাশে সানাউল্লাহ, মিজানুর রহমান ও মুকুল ইসলাম রেলের জমিতে দোকান ও মার্কেট নির্মাণ করছেন। মিজানুর রহমান বলেন, এখনো অনুমতি নেওয়া হয়নি; কাজ শেষ করে অনুমতির আবেদন করব। সানাউল্লাহ বলেন, আমি ধানি জমি হিসাবে লিজ নিয়েছিলাম, ধান আবাদ না হওয়ায় দোকান করে ভাড়া দিচ্ছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নন্দনগাছী স্টেশনের পাশে রেলের জমিতে ৩৮৬টি দোকান ও স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদন আছে মাত্র ৩৭টির। প্রতিটি দোকান থেকে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া তোলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘ম্যানেজ’ করে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এসব জমি দখল করেছে।
সরদহ রোড রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ইকবাল কবির বলেন, প্রভাবশালীরা রেলের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। বাধা দিলেও তারা শোনেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
পশ্চিম রেলের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. নাদিম সারওয়ার বলেন, নন্দনগাছী এলাকায় রেলের জমি দখলের বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। নকশা অনুযায়ী জরিপ করে দখল প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা ও উচ্ছেদ করা হবে। রেলের জলাশয় ভরাট করে মার্কেট নির্মাণের সুযোগ নেই। সত্যতা পেলে লিজ বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
