প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশিষ্টজনের অভিমত
বার্তা ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নে গুরুত্ব
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘কঠোর বার্তা’কে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা। তবে তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করার জন্য নির্দেশনা দিলেও নেতাকর্মীরা তা পুরোপুরি অনুসরণ করেননি। তাই প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা বাস্তবায়ন হবে কি না, এ নিয়ে সংশয় থেকে যায়। তাদের মতে, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু হুঁশিয়ারি নয়, অপরাধে জড়িত দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
রোববার বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তার ‘কঠোর’ অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চাঁদাবাজ ও দখলদারদের জায়গা বিএনপিতে নেই। দলের নেতাকর্মী, সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রীদের কেউ অপকর্মে জড়ালে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়, আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সংসদ-সদস্যদেরও জবাবদিহি করতে হবে।’
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলদারি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বার্তাকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তবে তার মতে, শুধু কঠোর বার্তাই নয়; এর বাস্তবায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, অপরাধের মূল কারণ ফায়দাভিত্তিক রাজনীতি। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া, অন্যায় করেও পার পেয়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে এসব অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও বিশৃঙ্খলা মূল সমস্যা না; এগুলো সমস্যার উপসর্গ। মূল সমস্যা হলো আমাদের কলুষিত রাজনীতি এবং ফায়দাভিত্তিক রাজনীতি। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনে নীতি ও আদর্শের পরিবর্তে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। ছাত্রদল, যুবদল কিংবা অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অনেকে নীতি-আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত ফায়দাকে গুরুত্ব দেন। বিভিন্ন ধরনের সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে, অন্যায় করেও পার পেয়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করা। তাই রোগের উপসর্গের চিকিৎসা করলে বা উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে না; রোগের মূল কারণ আমাদের চিহ্নিত করতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলের নেতাকর্মীদের দেশের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তিনি শুরু থেকেই দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধে নেতাকর্মীদের সতর্ক করে আসছেন এবং এখনো করছেন। এটিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে-দলের লোকজন তার কথা পুরোপুরি অনুসরণ করছেন না। ফলে সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে নেতাকর্মীরা সেই নিয়ম মেনে চলবেন, এমনটা মনে করার কারণ নেই। তাই এ বিষয়ে আমি খুব আশ্বস্ত হতে পারছি না। তবে নেতাকর্মীরা যদি তার কথা মানে তাহলে ভালো হবে।
‘বিএনপি নেতাকর্মীরা শৃঙ্খলার মধ্যে না এলে এর প্রভাব আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনেও পড়বে-এমন মত ব্যক্ত করে মান্না বলেন, নির্বাচনে অনেক বিষয়ের প্রভাব পড়ে। রাজনৈতিক সমীকরণ, নেতাকর্মীদের আমলনামা ও সরকারের শাসনপ্রক্রিয়া-সব মিলেই জনগণ ক্ষমতাসীন দলকে মূল্যায়ন করে। বিএনপির নেতাকর্মীদের এসব ব্যাপার আমলে নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর মানসিক অবস্থানের মূল্যায়ন করতে হবে।
চাঁদাবাজ-দখলদারদের বিরুদ্ধে শুধু হুঁশিয়ারি নয়, আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা নয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে। অবশ্য চাঁদাবাজ ও দখলদারদের দলে জায়গা হবে না-প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন তিনি। যুগান্তরকে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিলম্বে হলেও প্রধানমন্ত্রীর এ বার্তা ইতিবাচক ও সময়োপযোগী। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। এক্ষেত্রে উদ্যোগ নিতে হবে সরকার ও দলের পক্ষ থেকে। তার মতে, ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর থেকে সারা দেশে দলবাজি ও দখলবাজির যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার বড় একটি অংশের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম জড়িয়েছে। নির্বাচনের পর এসব ঘটনা আরও প্রকট হয়েছে। এর কিছু দৃষ্টান্ত সরকার ও বিএনপির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, তবে প্রধানমন্ত্রীর এ বার্তা যেন সাময়িক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ধারাবাহিকভাবে এ অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে এবং ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। শুধু স্থানীয় পর্যায়ে দলবাজি ও দখলবাজি নয়, উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতসংক্রান্ত যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও সরকারকে সতর্ক ও সক্রিয় হতে হবে।
আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীন দলীয় প্রধানের এ বার্তা শুধু স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখেই নয় বরং সরকারের পুরো মেয়াদে দলের নেতাকর্মীদের একাংশের ‘এবার আমাদের পালা’ প্রবণতার লাগামহীন দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজিকে টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে গৃহীত সুনির্দিষ্ট কৌশলের অংশ। অন্যথায় ক্ষমতাসীন দল ও সরকার যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার চেয়ে ভয়ংকর পরিণতি হবে দেশের। কারণ, এর ফলে যারা রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করবে তার পরিণতি দেশবাসীর জন্য চরম দুঃস্বপ্নের।
বিএনপিকে আগে নিজের ঘর পরিষ্কার করতে হবে-এমন মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দখলদার ও দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো ধরনের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনকেও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। নেতাকর্মীদের সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বার্তাকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে-এমন বার্তাকে কার্যকরভাবে দেখতে চাই। গুপ্ত ও স্বৈরাচারদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সতর্ক বার্তার বিষয়ে সাইফুল হক বলেন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দখলদাররা সাধারণত কোনো দল ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার ও সরকারি দলের চারপাশে জড়ো হয়। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারলে সমাজে বিরাজমান অস্থিরতা ও নৈরাজ্য কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, সংসদ-সদস্যসহ বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় দলকে সঙ্গে নিয়ে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে। সরকার এবং সরকারি দল আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করতে না পারলে অন্য অপরাধী ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে।

