কে এই জ্ঞানেশ কুমার
Advertisement
হৃদিতা ইফরাত
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশটির রাজধানীসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ চলছে। জেন-জির দল ককরোচ জনতা পার্টিসহ (সিজেপি) বিরোধী দলগুলো আন্দোলন স্লোগানে মুখর করে রেখেছে রাজপথ। জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে সামনে এসেছে নানা বিতর্ক। বড় বড় দুর্নীতিসহ দেশটির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীদের দাবি, নির্বাচনে ভোটচুরিসহ বিজেপি সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পেছন থেকে সহায়তা করছেন এ জ্ঞানেশ কুমার। জ্ঞানেশ কুমারের জন্ম উত্তর প্রদেশের আগ্রায়, ১৯৬৪ সালের ২৭ জানুয়ারি। তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি সরকারি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৮ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (আইএএস) যোগ দেন। কর্মজীবনের পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৬ সালে জ্ঞানেশ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জম্মু ও কাশ্মীরবিষয়ক বিভাগে যোগ দেন।
২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের পথ খুলে দেয়। আদালতের ওই রায় বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা একটি দলের প্রধান করা হয় জ্ঞানেশ কুমারকে। মন্দির নির্মাণের কাজ তদারকির জন্য ট্রাস্ট গঠনও ওই দলের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। চলতি বছর ওই ট্রাস্টের বিরুদ্ধে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনুদান হিসাবে পাওয়া কয়েকশ’ কোটি রুটি আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। সেখানে জ্ঞানেশ কুমারের নাম উঠে আসে।
তাকে ঘিরে সাম্প্র্রতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয় কেরালার সাবেক মুখ্যসচিব জিজি থমসনের অভিযোগ। ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দিল্লিগামী একটি বিমানে তাদের মধ্যে কথোপকথনের সময় থমসনকে বিজেপির হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরামর্শ দেন জ্ঞানেশ কুমার। থমসনের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমার তাকে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেরালার পাথানামথিট্টা আসন থেকে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার কথা বলেন। নির্বাচনে জয়ী হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন থমসন।
আন্দোলন তীব্র হওয়ার পর জ্ঞানেশ কুমারের কর্মজীবনের আরও পুরোনো একটি ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ২০০৬ সালের। তখন জ্ঞানেশ কুমার কেরালা সরকারের গণপূর্ত বিভাগের সচিব ছিলেন। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কেরালা স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (কেএসটিপি), বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। প্রকল্পটির আওতায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ভাগীরথা ইঞ্জিনিয়ারিং ও মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান পিএটিআইয়ের যৌথ উদ্যোগ পিএটিআই-বিইএল প্রায় ২১৬ কোটি রুপির কাজ পেয়েছিল।
প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব এবং ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির অর্থ প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানালে রাজ্যের অর্থ বিভাগ তাতে সম্মতি দেয়নি। এ সময় প্রকল্পটির প্রধান ব্যবস্থাপক মালয়েশীয় প্রকৌশলী লি সি বিন আত্মহত্যা করেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে কুয়ালালামপুরে তার মৃত্যুর পর ঘুস দাবির অভিযোগ সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার রেখে যাওয়া বলে দাবি করা নোটে প্রকল্পের বিল ছাড় করাতে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুস দাবির অভিযোগ ছিল এবং সেখানে জ্ঞানেশ কুমারের নামও ছিল।
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের সবচেয়ে বড় অংশ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কর্মসূচি। নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের কাজ চলছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ফলে যোগ্য ভোটারদের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং বিজেপি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলো আন্দোলন জোরদার করেছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে।
এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ভোটার, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ভোটার এবং প্রায় ৩ কোটি এমন ভোটার রয়েছেন, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিরোধীদের দাবি, এত বড় পরিসরে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভুল হলে যোগ্য ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা, নিবন্ধন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে তার দুই ডেপুটি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন।
