ব্যবসায়ী থেকে রাজনৈতিক মাফিয়া
শাহরিয়ার আলমের সম্পদের সাম্রাজ্য
Advertisement
তানজিমুল হক, রাজশাহী
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে চারবার সংসদ-সদস্য (এমপি) হয়েছিলেন শাহরিয়ার আলম। এর মধ্যে দুই দফায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। আওয়ামী লীগে তিনি ছিলেন দোর্দণ্ড প্রভাবশালী। শাহরিয়ার মূলত ছিলেন ব্যবসায়ী। ২০০৮ সালে প্রথম নির্বাচন করে বিজয়ী হন। তখন হলফনামায় ঋণগ্রস্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করলেও পরবর্তী ১৬ বছরে ঘটে তার অভাবনীয় উত্থান। শাহরিয়ার বনে যান কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক। ঢাকায় গড়ে তোলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিমুখী আটটি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ঢাকা, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটে রয়েছে মূল্যবান জমি, ফ্ল্যাট, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং এগ্রোফার্মসহ অঢেল সম্পদ। সরকারি টাকা লুট করে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন ব্রাজিল, চীন ও রাশিয়ায়।
লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার, দমন-পীড়ন, দখল আর পেশিশক্তি ব্যবহার করে শাহরিয়ার ব্যবসায়ী থেকে পরিণত হন রাজনৈতিক মাফিয়ায়। আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ জানালে তাদের বিরুদ্ধেও দেওয়া হতো মামলা। ফলে দলে শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীরা ছিলেন নিজ এলাকাতেই পরবাসী। তার নির্বাচনি এলাকায় প্রধান প্রতিপক্ষ, আসনটির বর্তমান এমপি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি তার নামে দেন ৮৫টি মামলা।
রাজশাহীতে শাহরিয়ারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট খুব ভোরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন চতুর শাহরিয়ার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি রাজশাহী ছেড়ে সড়কপথে গেদে সীমান্তে পৌঁছান। এরপর ভারতে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে থাইল্যান্ড হয়ে রাশিয়ায় চলে যান। তবে শাহরিয়ার বর্তমানে ভারতের কলকাতার নিউটাউনে সাড়ে তিন হাজার স্কয়ার ফুটের আলিশান একটি ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় স্ত্রী সিলভিয়া পারভীন লেনিকে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। সেখানে গড়েছেন স্থায়ী নিবাস। তার জন্য হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাঠানো হচ্ছে। তার বিশাল ফ্ল্যাটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, কেন্দ্র এবং রাজশাহী অঞ্চলের নির্বাসিত নেতারা নিয়মিত যাতায়াত করছেন। দেশকে অস্থিতিশীল করতে নেওয়া হচ্ছে নানা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে শাহরিয়ার চীন, রাশিয়া ও ব্রাজিল সফর করছেন।
এদিকে দেশে বর্তমানে শাহরিয়ারের ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্য এবং আর্থিক বিষয়টি সামলাচ্ছেন তার আপন ভাই সাইফুল ইসলাম বাদল, ব্যবসায়িক পার্টনার বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ী নাঈমুল বাশার চৌধুরী, মুহাম্মদ সাঈদ, রাজশাহীর ছাত্রলীগ নেতা হাসানুর সজল, বাঘা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা খাতুন লতার ছেলে তানজিম এবং চারঘাটের তসিকুল নামের এক ব্যক্তিসহ একটি শক্তিশালী চক্র।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই রাজশাহীর তিনটি থানায় শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ২৪ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে। এছাড়া শাহরিয়ারের ছয়টি ব্যাংক হিসাবে ২৬০ কোটি ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যুগান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
শাহরিয়ারের গার্মেন্ট ব্যবসা দেখছে শক্তিশালী চক্র : ২০০৮ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শাহরিয়ারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কৌশলী শাহরিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার শুরু করেন। ঘটতে থাকে তার অর্থনৈতিক উত্থান। দ্রুত তার গার্মেন্ট ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে। প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ গ্রুপ। তবে বর্তমানে গ্রুপটির মূল পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনার নেতৃত্বে (মালিকানায়) কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। গ্রুপটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ী নাঈমুল বাশার চৌধুরী। আর পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম মুহাম্মদ সাঈদ। এ প্রতিষ্ঠানটিতে শাহরিয়ারের ব্যবসা দেখভাল করছেন এমডি বাশার এবং পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদ।
ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেড দেশের আরেকটি শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটির মূল মালিক হলেন চারজন। এ প্রতিষ্ঠানটির এমডি শাহরিয়ার আলম। এই প্রতিষ্ঠানটিতেও শাহরিয়ারের অনুপস্থিতিতে তার প্রতিনিধিত্ব করছেন নাঈমুল বাশার চৌধুরী।
ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাউথইস্ট টেক্সটাইলস লিমিটেড। এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ারের রয়েছে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। এখানেও তার পক্ষে আর্থিক বিষয় দেখভাল করেন নাঈমুল বাশার চৌধুরী। এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য তার (নাঈমুল) দুটি নম্বরে ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তবে রেনেসাঁ গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম পরিচালক মুহাম্মদ সাঈদ বলেন, ‘শাহরিয়ার আলম শেয়ারহোল্ডার। উনি এখন নেই। ব্যবসা চলছে। লোকজন কাজ করছেন।’ শাহরিয়ারের ব্যবসা দেখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি ব্যবসাতে অনেকদিন থেকেই নেই। ব্যবসা আমরা চালাচ্ছি। এখন মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলব।’
শাহরিয়ারের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও সম্পদ দেখছেন বাবা, ভাই ও রাজনৈতিক সহযোগীরা : আওয়ামী লীগ শাসনমালে অংশীদারত্বে ব্যবসা ছাড়াও শাহরিয়ার ব্যক্তিগতভাবে গড়ে তোলেন নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান দেখভাল করছেন শাহরিয়ারের বাবা মো. শামসুদ্দিন, তার আপন ভাই সাইফুল ইসলাম বাদল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ও রাজশাহী জেলার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক হাসানুর সজল, বাঘা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা খাতুন লতার ছেলে তানজিম এবং চারঘাটের তসিকুল নামের এক ব্যক্তিসহ একটি শক্তিশালী চক্র।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে রাজশাহী মহানগরীর অভিজাত এলাকায় দুইশ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহরিয়ার গড়ে তোলেন বারিন্দ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের এমডি শাহরিয়ারের বাবা হলেও এখন বিএনপিপন্থি সংগঠন ড্যাবের চিকিৎসকরা এটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। চাউর রয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীতে শীর্ষ দুটি রাজনৈতিক দলের ফান্ডে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো ঝামেলা ছাড়া নির্বিঘ্নে ব্যবসা করছেন শাহরিয়ার।
রাজশাহীর বাঘার ব্যবসায়ী গোলাম হোসেন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না। ২০২০ সালে গোলাম হোসেনের শতকোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৪০ বিঘা জমি ক্ষমতা আর প্রতারণার মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে জোরপূর্বক নিয়ে নেন শাহরিয়ার। এরপর সেখানে গড়ে তোলেন বরেন্দ্র এগ্রো ফার্ম। গোলাম হোসেন সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও জমি উদ্ধার করতে পারেননি।
শাহরিয়ার এছাড়া কিনেছেন শতাধিক বিঘা জমি। রাজশাহী এবং ঢাকায় রয়েছে তার কয়েকটি প্লট ও ফ্ল্যাট। বাঘা ও চারঘাট উপজেলা সদরে শতকোটি টাকার মূল্যবান জমি কিনেছেন তিনি। পার্শ্ববর্তী লালপুর ও ঈশ্বরদীতে নামে-বেনামে শাহরিয়ারের জমি কেনার আরও তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার গুলশানে নিজের নামে দুটি এবং ছেলের নামে একটি ফ্ল্যাট কেনেন তিনি।
শাহরিয়ার বাঘার পার্শ্ববর্তী নাটোরের লালপুর উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মর্ত্তুজা বাবুর মেয়ে সিলভিয়া পারভীন লেনিকে ২০১৯ সালের দিকে বিয়ে করেন। এটি ছিল তার দ্বিতীয় বিয়ে। মন্ত্রিত্বের দাপট, দলীয় ক্ষমতা আর প্রভাব খাটিয়ে লেনির মা রোকসানা মর্ত্তুজাকে ২০২১ সালে লালপুরের গোপালপুর পৌরসভার মেয়র বানান শাহরিয়ার। লেনিকে লালপুরে কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি করে দেন। এছাড়া ঢাকার গুলশানে তাকে ৩৬০০ স্কয়ার ফুটের রাজকীয় একটি ফ্ল্যাট উপহার দেন। শাহরিয়ারের বাবা শামসুদ্দিন এবং ভাই সাইফুল ইসলাম বাদলসহ তার রাজনৈতিক সহযোগীরা ঢাকা ও রাজশাহীতে এসব সম্পদ দেখভাল করছেন। এ ব্যাপারে শামসুদ্দিন ও তার ছেলে বাদলকে একাধিকবার ফোন দিলেও তারা সাড়া দেননি।
বিএনপি নেতা চাঁদের বিরুদ্ধে ৮৫টি মামলা : নির্যাতন, হামলা আর মামলা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কঠোর হাতে দমন করতেন শাহরিয়ার। তার নির্বাচনি এলাকায় প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ। তিনি বর্তমানে একই আসনের বিএনপিদলীয় এমপি। চাঁদের নামে শাহরিয়ারের অনুসারীরা দিয়েছেন ৮৫টি মামলা। শুধু তাই নয়, শাহরিয়ারের নির্মম রোষানলের শিকার হয়েছেন অন্য বিএনপি নেতাকর্মীরাও। তাদেরও মামলা দিয়ে পুলিশের মাধ্যমে হয়রানি করেছেন শাহরিয়ার।
আবু সাঈদ চাঁদের বাড়ি চারঘাট উপজেলায়। তিনি বলেন, ‘শাহরিয়ার এবং তার সহযোগীরা আমার বিরুদ্ধে সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলা দিয়েছিলেন। আদালতের বারান্দা আর জেলখানাই ছিল আমার বাড়িঘর। গত ১৬ বছরের মধ্যে সাত বছরই জেলে ছিলাম। বাড়িতে একদিনের জন্যও আসতে পারিনি। এ সময় আমার মা এবং স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। কঠিন জুলুম আর নির্যাতনের শিকার হয়েছি।’
রেহাই পাননি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও : শাহরিয়ারের বিভিন্ন অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও রেহাই পেতেন না। তারা শাহরিয়ারের ক্ষমতা আর দাপটের কাছে ছিলেন অসহায়। প্রতিবাদ করলেই চালানো হতো নির্মম নির্যাতন। করা হতো বাড়িঘর ভাঙচুর। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও দেওয়া হতো মামলা। কারাগারে থাকতেন নেতাকর্মীরা। ফলে তারা ছিলেন নিজ এলাকায় পরবাসী। আওয়ামী লীগ নেতা বাঘা-চারঘাটের সাবেক এমপি রায়হানুল হক রায়হান, বাঘা পৌরসভার সাবেক মেয়র আক্কাস আলী, জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেরাজুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসএম তৌহিদ আল হাসান তুহিন, বাঘা উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মোকাদ্দেস আলী এবং বাঘা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক তিন সভাপতি রবি, সুরুজ ও মুক্তাসহ অসংখ্য নেতাকর্মী শাহরিয়ারের রোষানলের শিকার হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবলীগের একজন নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলেও আমরা ছিলাম নিজ এলাকায় পরাধীন। শাহরিয়ারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই শারীরিক নির্যাতন করা হতো। দেওয়া হতো মামলা। অনেকের নামেই ১০-১২টি করে মামলা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের ভয়ে বাড়িতে থাকতে পারতাম না। নিজ দলের প্রতিবাদী নেতাকর্মীদের কঠোর হাতে দমন করেছেন শাহরিয়ার এবং তার ক্যাডার বাহিনী।
