রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ সৌদির আকাশ শূন্য
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের চালানো প্রাণঘাতী হামলার জেরে সৌদির রাজধানী রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। সোমবার সেখানকার আকাশপথ ছিল প্রায় শূন্য। কোনো উড়োজাহাজ দেখা যায়নি। দেশটির দ্বিতীয় ব্যস্ততম কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়ে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধার নিরাপত্তা ও পরিচালনগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুবিধার্থেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে অন্তত চারবার বিমানবন্দরটিতে প্রাণঘাতী হামলা চালায় হুথিরা। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে গত শনিবার। ওই দিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুই বাংলাদেশিসহ অন্তত ১৩ জন নিহত হন। আহতের সংখ্যা ৩০০ জনেরও বেশি। বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল সৌদির ওই অঞ্চলে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এ ঘটনার পর রোববার আবারও হামলা চালায় হুথিরা। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন জানায়, রোববারের হামলায় অন্তত একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনালে নতুন এ হামলা হয়েছে।
এসব হামলার জেরে গত কয়েক বছরের মধ্যে সৌদি বিমান চলাচল ব্যবস্থায় বড় ব্যাঘাত ঘটেছে। বিমান চলাচল-বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, রোববার নির্ধারিত সব ফ্লাইটের ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশই বাতিল করা হয়েছে। ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ব্যবস্থায় দেখা গেছে সোমবার বিমানগুলো ওই শহরটি এড়িয়ে চলেছে। তবে অন্যান্য বিমান সৌদির আকাশসীমা অতিক্রম করেছে এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত প্রধান বিমান চলাচলকেন্দ্র জেদ্দায় অবতরণ করেছে। এ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বিমান সংস্থাকে তাদের পরিষেবা স্থগিত করতে হয়েছে। পাশাপাশি, রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মার্কিন বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদির ওপর দিয়ে বা সেখানে যাওয়ার সময় সতর্কতার পরামর্শ দেয়। শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান চলাচল-বিষয়ক সংস্থা ‘ইএএসএ’ সতর্কবার্তা আরও বিস্তৃত করে। লুফথানসা গ্রুপ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল করে।
অন্যদিকে, এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম সৌদির রাজধানীতে যাতায়াতকারী ফ্লাইটগুলোর পরিষেবা স্থগিত রাখার মেয়াদ বাড়িয়ে এ মাস পর্যন্ত করেছে। সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলের মেয়াদ বাড়ানো বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে আবুধাবির ইতিহাদ এয়ারওয়েজও রয়েছে। এর ফলে সোমবার ও মঙ্গলবার রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামগামী প্রায় ২০টি ফ্লাইট ব্যাহত হয়েছে।
হুথির সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি সৌদির বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তেল-সংক্রান্ত কার্যক্রম হ্রাসসহ বিভিন্ন কারণে এ বছর সৌদি আরবের প্রকৃত জিডিপি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সৌদি ভ্রমণে সতর্কতা জারি বিভিন্ন দেশের : সৌদির বিভিন্ন বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হুথি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের দেশটিতে ভ্রমণ না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে। আল জাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের অনুরূপ সতর্কবার্তার পর সোমবার অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সৌদি আরব ভ্রমণের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ জানিয়েছে, অস্ট্রেলীয়দের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এড়িয়ে চলা উচিত এবং সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দরে ভ্রমণের বিষয়টি ‘পুনর্বিবেচনা’ করা উচিত।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের নাগরিকদের সৌদির রাজধানীর প্রধান প্রবেশপথ এবং নাজরান, জাজান ও আসির প্রদেশে যে কোনো প্রয়োজনে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে সৌদি আরবে ‘অপরিহার্য নয় এমন’ ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস রোববার মার্কিন নাগরিকদের সৌদি আরবে ভ্রমণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্বাধীন বিশ্লেষক ও পরামর্শক ব্রেন্ডন সোবি বলেন, এ অঞ্চলের এবং এর বাইরের বিমান চলাচলের ওপর এসব হামলার প্রভাব কেমন হবে, তা এখনই বলা বা অনুমান করা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ ও সেই সংকটের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের ওপর যে প্রভাব পড়েছিল, ঠিক তেমনই সাম্প্রতিক সংকটের প্রভাবও নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর, যেমন-এই সংকট কতদিন স্থায়ী হয়, রিয়াদ বিমানবন্দর কতদিন বন্ধ থাকে এবং পুনরায় খোলার পর কতদিন ও কী মাত্রায় বিধিনিষেধ বলবৎ থাকে।’
সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আরাঘচির ফোনালাপ : হুথির এসব হামলার দায় নিতে নারাজ ইরান। তারা বলছে, এটা হুথি ও সৌদির অভ্যন্তরীণ বিষয়। সৌদির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ইরানসমর্থিত হুথিরা সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালানোর পর ওই অঞ্চলে যে উত্তেজনা বেড়েছে, তা নিয়ে দুই মন্ত্রী আলোচনা করেন। রোববার টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি বলেন, রাজনৈতিক সমাধানের পথ উপেক্ষা করে সামরিক পন্থার ওপর জোর দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে। এ অঞ্চলের সংকটগুলোর কোনো সামরিক সমাধান নেই। তিনি বলেন, সৌদি ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু এবং রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় যে কোনো সহায়তা দিতে ইরান প্রস্তুত।
হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘জায়ান্টস ব্রিগেড’ : গত ৫ অক্টোবর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের অভিযান শুরু করে ইয়েমেনের আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী ও ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ (এসটিসি)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী। এর মধ্যে শক্তিশালী ‘সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেড’ অন্যতম। সোমবার বিকালের মধ্যে ‘জায়ান্টস ব্রিগেড’-এর নেতৃত্বাধীন সরকারপন্থি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোচা এবং জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দাবের মধ্যে সংযোগকারী প্রধান সড়কটি বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে।
