মৌচাক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হত্যা
প্রধান আসামির জামিনের ব্যবস্থা করেন নিহতের স্ত্রী
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মৌচাক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার হত্যা মামলার বাদীর বিরুদ্ধে আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নগদ টাকার বিনিময়ে মামলার প্রধান আসামি দিদারুল ইসলাম বাবুসহ দুই আসামির জামিনের পক্ষে আদালতে লিখিত সমঝোতার প্রস্তাব (হলফনামা) দিয়েছেন তিনি। তার সম্মতিতে আসামিরা জামিনে মুক্ত হন। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে নিহত বিল্লালের স্ত্রী আম্বিয়া খাতুনের বিরুদ্ধে গুরুতর এ অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন আম্বিয়া খাতুন।
চলতি বছরের ৮ জুন রাত ৮টার দিকে সালিশের কথা বলে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় বিল্লাল হোসেনকে। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ছিলেন। এ ঘটনায় নিহত বিল্লালের স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭/৮ জনকে আসামি করে ৯ জুন রমনা থানায় মামলা করেন। আসামিদের মধ্যে দিদারুল ইসলাম বাবুর নাম রয়েছে শীর্ষে। বাবু ছাড়াও আসামির তালিকায় রয়েছেন-রিয়াজুল হাসান, মো. আল আমিন মাহিন, সিরাজ, মো. বাবুল বন্দুকসী, লুৎফর রহমান, সাইফুল ইসলাম জমাদার, কাবাদ হোসেন, সুজন, রকিবুল ইসলাম শিহাব ওরফে গোল্ডেন রাকিব, সুমন, জুয়েল, সোহেল, হৃদয়, রশিদ, সিয়াম, লিটন দর্জি, সোহেল, পারভেজ, বিল্লাল ও ছাত্তার।
ঢাকার সিএমএম আদালতে গত ১২ আগস্ট বাদী আম্বিয়া খাতুন তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত হলফনামা দিয়ে আসামি বাবু ও ছাত্তারের জামিনের ব্যাপারে আপত্তি নেই মর্মে ঘোষণা দেন। এমনকি বিল্লাল হত্যায় তারা জড়িত নয়-এমন কথাও বলেন তিনি। তার আবেদনের ওপর আদালত শুনানি গ্রহণ করেন। পরে তাদের জামিন হয়। এছাড়া প্রধান আসামি জামিন পাওয়ায় সেই রেফারেন্সে আরও ৫ আসামি জামিন পান।
জানা গেছে, নিহত বিল্লাল হোসেন দুই বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন ছিলেন মামলার বাদী। তিনি আসামিদের সঙ্গে আপসনামা করায় ক্ষুব্ধ হন দ্বিতীয় স্ত্রী সানজিদা ইসলাম। তিনি এ ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না। পালটা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তাদের পরিবার থেকে জানানো হয়েছে। তবে এ মামলা কোন ধারায় হবে, কোথায় কবে এ মামলা হবে কিংবা কারা আসামি হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নিহত বিল্লালের প্রথম স্ত্রীর সংসারে দুই ছেলে দুই মেয়ে রয়েছে। এই চার সন্তানের স্বার্থ রক্ষায় তাদের মাকে আসামি করা হবে কিনা তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় রয়েছেন তারা। তবে যেসব আসামি হলফনামামূলে জামিন পেয়েছেন তাদের জামিন ঠেকাতে মামলা বা নারাজি আবেদন হচ্ছে এটা নিশ্চিত। নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী সানজিদা ইসলাম বলেন, আমরা এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচার চাই। আম্বিয়ার এই কাজের পর আমরা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় আসামিদের জামিন করানোর নেপথ্যে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা পরিবারের সদস্যদের। ফলে তদন্তের দিকে তাদের তাদের মনোযোগ কম। ঘটনার পর চার মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তের অগ্রগতির কথা জানাতে পারেনি পুলিশ।
বাদী আম্বিয়া খাতুন মামলার এজাহারে যা বলেছিলেন : আসামি দিদারুল ইসলাম বাবু আনারকলি মার্কেটের ফুটপাত ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল ও ময়লা বিলের নাম করে চাঁদা নেয়। ফুটপাতের উপরে নতুন দোকান বসালে বাবুসহ অন্য আসামিরা নিয়ন্ত্রণ করত। এই নিয়ে স্থানীয় ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে আমার ভাগিনা আকাশেরও বিরোধ ছিল। ঘটনার দিন বাবু আকাশের বিষয়ে সালিশের কথা বলে বিল্লালকে মার্কেটের পেছনে ডেকে নেয়। সেখানে বাবুসহ অন্যরা পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করে এবং এলোপাতাড়ি কিল-ঘুসি এবং হকিস্টিক দিয়ে মারধর করতে থাকলে বিল্লাল আহত হয়ে পড়ে যায়। তখন বাবুসহ অন্য আসামিরা বিল্লালের হাত-পা চেপে ধরে বলে, শালাকে জানে মেরে ফেল। পরে আসামি রিয়াজুল ধারালো ছোরা দিয়ে বুকে আঘাত করে। এতে বিল্লাল গুরুতর আহত হয়। আসামিরা আকাশকেও হকিস্টিক, লাঠি দিয়ে মারধর করে। তার আর্তচিৎকারে সাধারণ লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা পালিয়ে যায়।
হলফনামায় যা বললেন বাদী : প্রধান আসামি দিদারুলের জামিনের জন্য আম্বিয়া খাতুনের স্বাক্ষর করা হলফনামায় বলেছেন, ‘এজাহারে বলা হয়েছে, মামলার ১ নম্বর আসামি দিদারুল ইসলাম বাবু ঘটনাস্থলে থেকে আমার স্বামীকে হত্যার করার হুকুম দিয়েছেন। আমি পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে, আমার স্বামীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন। এমনকি আমার স্বামী আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে দূরে অবস্থান করছিলেন। আমি একটি ভিডিও ফুটেজে দেখতে পাই, আমার স্বামী আঘাত পেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দিদারুল ইসলাম বাবু দূর থেকে দৌড়ে এসে তার জীবন বাঁচাতে জরুরি চিকিৎসার জন্য রিকশায় তুলে নেন।’ আসামি ছাত্তারের পক্ষে হলফনামায় আম্বিয়া বলেন, ‘আমার এজাহারে উল্লিখিত আসামি ছাত্তার এবং গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি সাত্তার মাদবর একই ব্যক্তি নয়। যা আমার স্বামীর সঙ্গে থাকা ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী অর্থাৎ আহত ভিকটিম আকাশের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়েছি। সাত্তার মাদবর জামিন এবং অব্যাহতি পেলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’
নিহত বিল্লালের ভাই হেলাল সাদী জানান, আসামিদের মধ্যে কারাগারে আছেন রিয়াজুল হাসান ও তদন্তেপ্রাপ্ত আসামি খাজা হাবিব। এছাড়া দিলদারুল ইসলাম বাবু ও লুৎফর রহমানসহ সাতজন জামিনে আছেন। তিনি বলেন, হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত দিদারুল ইসলাম বাবুকে গ্রেফতার করা হয়নি। তিনি আগাম জামিনে আছেন। তাকে জামিন পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্গের টাকার বিনিময়ে আম্বিয়া খাতুন এই কাজ করেছেন। এরপর থেকে আম্বিয়ার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারিনি। তিনি টাকা নিয়ে ঢাকার বাইরে চলে গেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আম্বিয়া খাতুন যুগান্তরকে জানান, আইও (তদন্ত কর্মকর্তা) কাগজে তার স্বাক্ষর করিয়ে নেন। তাকে বলা হয়েছিল, মামলার তদন্ত সংক্রান্ত প্রয়োজনে স্বাক্ষর দরকার। তাকে কাগজটি পড়তেও দেওয়া হয়নি। পরে জানতে পারেন, আসামি জামিন পেলে তার আপত্তি নেই-এমন কথা সেই কাগজটিতে লেখা ছিল। আম্বিয়া খাতুনের দাবি করেন, এ ঘটনার পর তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এজন্য তিনি পুলিশ কিংবা আদালতে গিয়ে অভিযোগ জানাতে পারেননি। মামলার অগ্রগতির তথ্য জানাতে তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার পরিদর্শক আতিকুল আলম খন্দকারকে যুগান্তরের পক্ষ থেকে ফোন করে জানতে চাইলে তিনি গড়িমসি করেন। বাদীর হলফনামায় স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার তার মুঠোফোন নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিয়ে সাড়া মেলেনি। এ বিষয়ে এক আইনজীবী বলেন, আম্বিয়া খাতুন লিখিত সমঝোতার কপি উপস্থাপনের পাশাপাশি আদালতে উপস্থিত হয়ে এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

