Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ

ঘুম থেকে চিরঘুমে ১২ প্রাণ

আহত ৩০, তদন্ত কমিটি গঠন * ঘুমিয়ে ছিলেন চালক, বাস চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার-আহত যাত্রীর বর্ণনা * নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহায়তার ঘোষণা * ২০১৪ সালের এই দিনেই বড়াইগ্রামে বাস দুর্ঘটনায় ৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন

Advertisement

Icon

মো. শহীদুল হক সরকার, নাটোর ও অহিদুল হক, বড়াইগ্রাম

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুম থেকে চিরঘুমে ১২ প্রাণ

নাটোরের বনপাড়ায় ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহতদের ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা, সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। মঙ্গলবার হাইওয়ে থানায় -যুগান্তর

Advertisement

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাবা-মেয়ে, দুই চালকসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩০ জন। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্র এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় আহত দুই বাসযাত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ভোররাতে চালক গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। পরে বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। তিনিই বাম লেন থেকে ডান পাশের লেনে চলে গেলে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির গঠন করেছেন।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন জানান, ভোরে নাটোর থেকে বালুবোঝাই একটি ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো ট ২২-৬২০৬) সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনাবগঞ্জগামী যাত্রীবাহী বাস আরপি স্পেশালের (ঢাকা মেট্রো ব ১২-৪৪৪৫) মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন। পরে আহতদের উদ্ধার করে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে নেওয়া হলে সেখানে আরও ৩ জন মারা যান। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আক্তার হামিদ জানান, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন-বাসচালক রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও শহীদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ (৩২), ট্রাকচালক ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়িয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে আবু কালাম (৫৫), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল (৩৩) ও ফরিদপুর সদর উপজেলার বাকুমদিয়া গ্রামের ওমর জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার (৩৫)।

সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, স্থানীয় সংসদ-সদস্য আব্দুল আজিজ, নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক ও বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরে হুইপ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।

নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান জানান, দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহতদের মধ্যে নাটোর বাগাতিপাড়ার জুলফিকার আলী (৪১), চাঁপাইনবাবগঞ্জ গোমস্তাপুরের শামীম হোসেন (১৮), রাজশাহী মহানগরীর কাজলা এলাকার ফজলুর রহমান (৬০), সিয়াম (১৭), ডালিম (৩০), নওগাঁ সাপাহারের নূর হোসেন (৩২), বরিশালের বাবুগঞ্জের শহিদুল ইসলাম (৩৫), ঝিনাইদহের ডাক্তার মুশফিকুর রহমান (৩১), চাঁপাইনবাবগঞ্জ ভোলাহাটের তামিম হোসেন (১৭), ঝিনাইদহের জুয়েল কিবরিয়া (৪০) ও তৌহিদ (৪০), রাজশাহী গোদাগাড়ির মজনু চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের নয়ন (৩৩) ও ববি খাতুন (৩০), মাদারীপুরের ঈসা (১৮) ও নার্গিস বেগম (৫০), নওগাঁর নিয়ামতপুরের চিরঞ্জিত (৩০), পটুয়াখালীর লাবিব (১২) ও রুবিনা খাতুন (৪২) এবং যশোর সদরের নাদিম হোসেনকে (২৪) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আহত আরও কয়েকজনকে পরিবারের সদস্যরা বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেছেন। এর বাইরেও আহতদের মধ্যে শরীয়তপুর জেলার আলমগীর মাতবর (৫৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আব্দুস সালাম (৩৫), শিবগঞ্জের ওয়াহিদ আলী, বরগুনার জেসমিন আক্তার (৩৫), নওগাঁর মান্দা উপজেলার মানিক হোসেন (৩৭), শাহাজুল ইসলাম (৩৬), লক্ষ্মীপুর জেলার রাকিব হোসেন (২৫) বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

ঘুমিয়ে ছিলেন চালক, বাস চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার : ‘ভোররাতে ড্রাইভার গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। পরে বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। তিনিই বামের লেন থেকে ডানের লেনে চলে গেলে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এরপর আমাদের চেতনা ফিরলে দেখি কয়েকজন আমাদের মোবাইল, মানিব্যাগ, পকেটের টাকা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাসের মধ্যে আটকে থাকার কারণে আমরা কিছুই বলতে পারছিলাম না। তবে, কিছু মানুষ ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতাও করেছেন,’ মঙ্গলবার সকালে চোখ মুছতে মুছতে এভাবেই বলছিলেন নাটোরের বনপাড়ায় দুর্ঘটনা কবলিত যাত্রী রমজান আলী ও আব্দুস সালাম। তারা আরও বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঘুমচোখে বেপরোয়া গতিতে বাস চালানোর কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। রমজান আলী বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশে শরীয়তপুর থেকে বাসটিতে উঠেন তিনি। বাসে উঠে তিনি বি-২ সিটে বসেন। এরপর থেকে তিনি চালকের বেপরোয়া বাস চালানো লক্ষ্য করে একাধিকবার সতর্ক করেন। যাত্রীদের কথা উপেক্ষা করে চালক তার মতো করেই বাসটি চালান। পাবনা পার হওয়ার পর থেকে বাসটি সড়কে কিছুটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে থাকে। পরে বনপাড়া এসে বাসটি ডানদিকে রং সাইডে চেপে গেলে ট্রাকের সঙ্গে সজোরে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় বাস ও ট্রাকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। নিহতদের প্রায় সবাই বাসে ঘুমিয়ে ছিলেন।

এই প্রত্যক্ষদর্শী আরও জানান, তিনি না ঘুমিয়ে জেগে থাকায় অন্যদের তুলনায় কম আহত হয়েছেন। অপর আহত আব্দুস সালাম বলেন, বাসে সিট ছাড়াও মাঝে টুল দিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল।

২০১৪ সালের এই দিনেই (২০ অক্টোবর) বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে দেশের সবচেয়ে বড় বাস দুর্ঘটনায় ৩৮ জন যাত্রী নিহত হন। সেই শোকাহত দিনের ১২ বছর পূর্তির দিনে আবারও ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটল।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ ঘুম থেকে চিরঘুমে ১২ প্রাণ

ঘুম থেকে চিরঘুমে ১২ প্রাণ

রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল এক হয়ে ষড়যন্ত্র করছে

পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল এক হয়ে ষড়যন্ত্র করছে

খালার বাড়ি যাওয়া হলো না দুই শিশুর বাবা-মেয়ের মৃত্যু মা-ছেলে হাসপাতালে

বাবা-মেয়ের মৃত্যু মা-ছেলে হাসপাতালে

বাঁওড় এলাকায় মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প তিন কোটি টাকার মাছ ছাড়তে খরচ ৪৫ কোটি

তিন কোটি টাকার মাছ ছাড়তে খরচ ৪৫ কোটি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম