Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

আইনি প্রশ্নের মুখে ইশরাক

আত্মরক্ষা ছাড়া বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন অবৈধ

Advertisement

সিরাজুল ইসলাম

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আত্মরক্ষা ছাড়া বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন অবৈধ

Advertisement

আইন প্রণয়নের দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারা নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে মাঠে অভিযান পরিচালনা করলে তা রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ও ক্ষমতার বিভাজন নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। অথচ শনিবার এমন ঘটনাই ঘটেছে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকায়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (সদ্য পদত্যাগকারী) ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ-সদস্য ইশরাক হোসেন সেখানে একটি অভিযান চালান। নিজের ফেসবুক পেজে তিনি অস্ত্র হাতে সেই অভিযানের ভিডিও প্রকাশ করেন। মুহূর্তেই ভাইরাল। এরপরই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অস্ত্র বৈধ হলেও একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযান চালাতে পারেন কি না-তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের সংবিধান ও আইন-এর কোনো বৈধতা দেয় না। 

আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, সংবিধানের মূল ভিত্তি আইনের শাসন। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পুলিশের পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযানের দায়িত্ব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। মন্ত্রী, সংসদ-সদস্য বা অন্য যে কেউই হোন না কেন, কারও সরাসরি অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযান চালানোর এখতিয়ার নেই। পু

লিশের ভূমিকায় তাদের অবতীর্ণ হওয়ার কোনো সুযোগ আইনি কাঠামোতে নেই। ফৌজদারি কার্যবিধি এর কোনো বৈধতাও দেয় না। তারা বলেন, মাদকবিরোধী সামাজিক উদ্যোগ প্রশংসনীয় হতে পারে। তবে আইনি শৃঙ্খলার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নির্দেশ প্রদানসহ অভিযান মনিটরিং করতে পারেন। কিন্তু তাদের পুলিশের মতো অভিযানে নামার সুযোগ নেই। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন, ‘কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। আইন প্রয়োগের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে। কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা সংসদ-সদস্যকে আইন প্রয়োগ বা অভিযান চালানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সুতরাং অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন আইন লঙ্ঘন করেছেন। সরকার ইচ্ছা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমি মনে করি, এ বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

এদিকে, অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিমন্ত্রীর মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে অনুযায়ী তিনি সোমবার পদত্যাগও করেন। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো পুলিশি তদন্ত হচ্ছে না। পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি যুগান্তরকে বলেন, ‘ওয়ারী বিভাগে কোনো ধরনের তদন্ত বা অভিযোগ নেই। এ বিষয়ে আমাকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এ-সংক্রান্ত কোনো লিখিত বা মৌখিক নির্দেশনাও নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু আমার এলাকায় একটি ঘটনা ঘটেছে, তাই এটি স্বাভাবিক নিয়মেই কমিশনারকে ইনসিডেন্ট রিপোর্ট বা নোটিশ আকারে দেওয়া লাগে। সেটি দিয়েছি। এর বাইরে অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা কার্যক্রম হচ্ছে না। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাইলে বা নির্দেশ দিলে পরবর্তীতে এ বিষয়ে তদন্ত হতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন দাবি করেছেন, তার অস্ত্রটি সম্পূর্ণ বৈধ। সাধারণ মানুষের অভিযোগে তিনি সেখানে গিয়েছেন। মারমুখী লোকজনের হাত থেকে বাঁচতেই তারা অস্ত্র উঁচিয়েছিলেন। তবে আইনজীবীদের মতে, আইনের দৃষ্টিতে এই যুক্তির সুযোগ সীমিত। কারণ, বৈধ অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষার জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যায়। জনসমক্ষে অস্ত্র উঁচিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা অস্ত্র আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। ভিডিওতে দেখা গেছে, বৈধ অস্ত্র ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ যুগান্তরকে বলেন, অস্ত্র আইন অনুযায়ী উপযুক্ত আয়করের রেকর্ড সাপেক্ষে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুটি ভিন্ন ক্যাটাগরির অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে পারেন। তবে এই অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষার স্বার্থেই দেওয়া হয়, কোনোভাবেই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য নয়। একই সঙ্গে অস্ত্র যত্রতত্র প্রদর্শন বা স্বেচ্ছাচারী ব্যবহারে আইনে সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের উদ্দেশ্য ভালো থাকলেও এর পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল। একজন মন্ত্রীর মূল কাজ নীতনির্ধারণ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া। মাঠপর্যায়ে কাজ করার সরাসরি দায়িত্ব মন্ত্রীর নিজের নয়, বরং তার অধীনে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর সেই দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে আইন প্রয়োগ করানো উচিত ছিল। 

মনজিল মোরসেদ জানান, প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করায় এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, ঘটনার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি বা ব্যত্যয় ছিল। সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষ উভয়েই এটি মেনে নিয়েছে। অস্ত্র প্রদর্শন বা লাইসেন্সিং শর্ত ভঙ্গের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা তদন্ত করে দেখতে পারে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে শর্ত ভঙ্গ হয়েছে। চূড়ান্তভাবে প্রমাণ মিললে লাইসেন্স বাতিল, জরিমানা কিংবা সতর্ক করার মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আইন কী বলে : বেসামরিক নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। আইনে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয় কেবল ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার স্বার্থে। কোনো ধরনের অভিযান বা বলপ্রয়োগের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয় না। অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখানো দণ্ডবিধির ৫০৩ ও ৫০৬ ধারায় অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন হিসাবে গণ্য।

আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার রয়েছে দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায়। তবে সেখানে আসন্ন বিপদের শর্ত থাকে। নিজের বা অন্যের জীবনের ওপর উপস্থিত ঝুঁকি ছাড়া অস্ত্র ব্যবহার করার সুযোগ নেই। পূর্বপরিকল্পিত অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শন আত্মরক্ষার সংজ্ঞায় পড়ে না। বরং এটি লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ এবং ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।

মাদকবিরোধী অভিযানের দায়িত্ব কার : মাদকদ্রব্য উদ্ধারে দেশে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮’ রয়েছে। আইন অনুযায়ী তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মাদকদ্রব্য উদ্ধার অভিযান পরিচালনার তালিকায় কোনো মন্ত্রী বা সংসদ-সদস্যের নাম নেই। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিজে অভিযান চালানোর আইনি ক্ষমতা রাখেন না। 

নাগরিক অধিকার : এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেমন-প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সমালোচনা হচ্ছে, তেমনি অনেকে তার পক্ষেও যুক্তি দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, দেশে মাদক যেভাবে মহামারি আকার ধারণ করেছে তাতে করে স্থানীয় সংসদ-সদস্য হিসাবে তিনি এটা করতেই পারেন। সচেতন নাগরিক হিসাবে অপরাধী ধরার অধিকার ইশরাক হোসেনের রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৫৯ ধারায় সাধারণ মানুষের আটকের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা আছে।

ওই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি চোখের সামনে জামিন অযোগ্য অপরাধ দেখলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটকানোর ক্ষমতা রাখেন। তবে দ্রুত তাকে পুলিশে হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু দলবল নিয়ে বস্তি ঘেরাও করার ক্ষমতা কোনো নাগরিককে দেওয়া হয়নি। এমনকি কাউকে তল্লাশি করার আইনি বৈধতাও নাগরিকের নেই। বিধিবহির্ভূতভাবে কাউকে আটকে রাখলে দণ্ডবিধির ৩৪১ ও ৩৪২ ধারায় তার বিরুদ্ধে অন্যায় প্রতিরোধ ও অবরুদ্ধকরণের অভিযোগ গণ্য হবে।

সাংবিধানিক অধিকার : সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সব নাগরিক আইনের চোখে সমান। ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের বাইরে কোনো নাগরিকের প্রতি আচরণ করা যাবে না। ৫৫ অনুচ্ছেদে মন্ত্রিসভার দায়িত্ব নির্ধারণ করা আছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা সরকারের কাজ পরিচালনা করে। সংবিধান কোনো মন্ত্রীকে নিজের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দেয়নি। মন্ত্রীরা নীতিনির্ধারণ করবেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। মাঠপর্যায়ে তদারকি নিশ্চিত করবেন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

আ.লীগ পরিচয় পেলে ভিক্ষা নিতেন না মকবুল

আ.লীগ পরিচয় পেলে ভিক্ষা নিতেন না মকবুল

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

ইশরাকের নাটকীয় পদত্যাগ

রাতে গুজব দাবি, দিনে সত্যতা স্বীকার প্রতিমন্ত্রীর ইশরাকের নাটকীয় পদত্যাগ

নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা

নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা

পদত্যাগের পর ইশরাকের স্ত্রীর রহস্যময় পোস্ট

পদত্যাগের পর ইশরাকের স্ত্রীর রহস্যময় পোস্ট

আরও পড়ুন

রাতে গুজব দাবি, দিনে সত্যতা স্বীকার প্রতিমন্ত্রীর ইশরাকের নাটকীয় পদত্যাগ

ইশরাকের নাটকীয় পদত্যাগ

নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা

নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা

ফ্রান্সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কারফিউ জারি

ফ্রান্সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কারফিউ জারি

স্বৈরাচার ফেরার পথ খুলে দেওয়া হবে শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি: প্রধানমন্ত্রী

স্বৈরাচার ফেরার পথ খুলে দেওয়া হবে শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি: প্রধানমন্ত্রী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম