আরেক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড
সৌদির বিচারব্যবস্থা নিয়ে এইচআরডব্লিউ’র প্রশ্ন
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির বিচার প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হলেও দেশটির পক্ষ থেকে এখনো কিছু পাওয়া যায়নি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশিদের বিচারের সময় তাদের জন্য কোনো দোভাষী বা আইনি প্রতিনিধিত্ব ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় কতটা ‘ন্যায়বিচার’ হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে শনিবার হাসান জাকি আল-ফারাজ নামে আরেক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি সরকার। এ নিয়ে দেশটির প্রশাসনের বিচারব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হিউম্যান রাইট ওয়াচ। মিউলইস্টআইডটনেট-এর ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব এমন এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, যিনি শিশু থাকা অবস্থায় অপরাধ করেছিলেন। হাসান জাকি আল-ফারাজের বিরুদ্ধে ১৪ বছর বয়সে অপরাধ করার অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ‘অন্য আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা’।
এইচআরডব্লিউ-এর সৌদি আরববিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক জোই শে বলেন, ‘হাসান আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটা অত্যন্ত অমানবিক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং অন্যায্য বিচারের দীর্ঘ নথিবদ্ধ ইতিহাস।’ তিনি বলেন, ‘সুপ্রিমকোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ইউসুফ আল-মানাসিফ নামে আরেকজন এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।’
এইচআরডব্লিউ-এর ভাষ্যমতে, আল-ফারাজকে ২০১৭ সালে গ্রেফতার করা হয় এবং ২০২২ সালে সৌদি আরবের বিশেষ অপরাধ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আল-ফারাজকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং এই মামলায় ব্যবহৃত একটি স্বীকারোক্তিমূলক নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও জানিয়েছে, তাকে (আল-ফারাজ) নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছিল।
তবে সৌদি সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই এবং তাদের দেশের আইন ও বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনেই পরিচালিত হয়।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে ১৯ অক্টোবর সংবাদ প্রচার করে মিডলইস্টডটনেট। সেখানে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা পূর্ণাঙ্গ রায়ের একটি অনুলিপি এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতির বিষয়ে তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘চলতি বছর এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে ১৭৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে; তাদের অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক।’
এদিকে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি নথি অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক ২০২৩ সালের আগস্ট থেকেই ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগে আটক ছিলেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ১৮ অক্টোবর এই নথিটি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের নাম নজরুল ইসলাম আব্দুল বসির ও সুইটি আক্তার। তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মক্কায়।
৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের হাতে আসা বন্দিদের তালিকা অনুযায়ী, নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনের আওতায় আটক করা হয়। এর পরদিন ব্যভীচারের অভিযোগে সুইটি আক্তারকে আটক করা হয়।
নথি অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম জেদ্দার একটি সংশোধন কেন্দ্রে (কারাগার) এবং সুইটি আক্তার জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দি ছিলেন। তারা দুজনেই আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসাবে কাজ করতেন।
বন্দিদের তালিকায় তাদের কারও বিরুদ্ধেই মৃত্যুদণ্ডের কোনো উল্লেখ ছিল না। তালিকায় ৯৭ জন বন্দির অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকলেও দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কলামে কোনো তথ্য দেওয়া ছিল না।
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
তথ্যমতে, এর আগে সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ আইন বা ব্যভীচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে-এমন কোনো নজির নেই।
নথি অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমানে ৩০৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪৭ জনের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর। এতে সাইবার অপরাধের তিনটি আলাদা মামলার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর ছিল। এতে আরও বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড বা তা কার্যকর করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনোভাবেই বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলকে অবহিত করেনি।
এ পরিপ্রেক্ষিতে কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়েছে, যেখানে রায়ের অনুলিপি এবং বিচার প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। কনস্যুলেট জানিয়েছে, রায় হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

