তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন
চীনা কোম্পানির প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন
এত অদক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে গ্যাস সংকট সহজে কাটবে না, বাড়বে-মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্য * গোঁজামিলে ভরা প্রস্তাবটি রীতিমতো সন্দেহজনক
Advertisement
শাহেদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে তৃতীয় ফ্লোটিং স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসানোর উদ্যোগ শুরুতেই হোঁচট খেল। পেট্রোবাংলার অদক্ষতায় প্রক্রিয়াটি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। চায়না ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (সিএনইই) নামে চীনা কোম্পানির দক্ষতা এবং চার্জ ঠিকমতো যাচাই না করেই অনভিজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করে পেট্রোবাংলা তা জ্বালানি বিভাগে প্রস্তাব আকারে পাঠায়। পরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর এবং গোঁজামিলে ভরা প্রস্তাবটি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। প্রস্তাবে অনেক প্রশ্নের জবাব না থাকায় সেটি ফেরত পাঠানো হয়।
কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, জ্বালানি বিভাগ তাড়াহুড়া করে স্পর্শকাতর একটি প্রস্তাব মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠিয়েছে। এত অদক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে গ্যাস সংকট সহজে কাটবে না, বাড়বে। অভিযোগ উঠেছে, পেট্রোবাংলা ১৫ বছরের জন্য সিএনইই’কে দিনে ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার চার্জ অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। আর ২০ বছরের জন্য হলে দিতে হবে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ডলার করে।
এছাড়া পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে ভাসমান টার্মিনাল বসানোর আর যেসব প্রস্তাব ছিল, সেগুলোর সঙ্গে সিএনইই-এর তুলনামূলকভাবে কোনো চিত্র বা এ সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যাও ছিল না। ভাসমান টার্মিনাল বসানোর মতো এত বড় প্রকল্পে ঠিকমতো আর্থিক বিবরণীও দেওয়া হয়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৩ অক্টোবর ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তাবটি ফেরত পাঠায়।
ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেছেন, জ্বালানি বিভাগ অনেকটা তাড়াহুড়া করে এত স্পর্শকাতর একটি প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে। অথচ কমিটির বৈঠকটি ছিল জুমে, শুধু জরুরি এজেন্ডা অনুমোদনের জন্য। সেখানে এফএসআরইউ বসানোর মতো এজেন্ডা অনেকটা গোঁজামিল দিয়ে পাঠানো হয়েছে, যা রীতিমতো সন্দেহজনক। তিনি বলেন, এভাবে অদক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে গ্যাস সংকট সহজে কাটবে না, বাড়বে। তাই জ্বালানি বিভাগকে আরও দক্ষতার সঙ্গে ওই প্রস্তাবে কাজ করতে বলা হয়েছে।
দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এ টার্মিনাল দিয়ে আমদানি করা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করে দিনে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়। এর একটি হচ্ছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট। যার দিনে চার্জ ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং দ্বিতীয়টি সামিট গ্রুপের, যার দিনে চার্জ ২ লাখ ৫১ হাজার ৪০৫ ডলার। ২০২৫ সালের নভেম্বরে গ্যাস কোম্পানি-আরপিজিসিএল এক সমীক্ষা করে দেখেছে, প্রস্তাবিত মহেশখালীর কতুব জোনে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল বসালে দিনে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার চার্জ দিতে হবে। সেখানে সিএনইই দাবি করেছে ১৫ বছরের জন্য (২০১৬ মডেলের জাহাজে) ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার।
আরপিজিসিএল বলছে, সিএনইই-এর এই চার্জ তাদের সমীক্ষার চেয়ে বছরে ৮৬ লাখ ডলার বেশি। এই হিসাবে ১৫ বছরে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হবে ১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা দেড় হাজার কোটি টাকা বেশি। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দিনে চার্জসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে প্রতিটি টার্মিনালকে (সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জি) চার্জ দিতে হয় ৭৮ লাখ ডলার। কিন্তু সিএনইই-এর দাবি মানলে এই চার্জ আসবে ১ কোটি ডলারের বেশি।
প্রসঙ্গত, তৃতীয় টার্মিনাল বসাতে সামিট দৈনিক ৩ লাখ ডলার চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। সেই চুক্তি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাতিল করা হয়। এছাড়া সৌদির আরামকো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দিনে ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার চার্জ নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল, তবে সেটি বেশি দূর এগোতে পারেনি।
সিএনইই-এর প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারে পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি বিভাগ থেকে বলা হয়, চীনের এই কোম্পানি এলএনজি টার্মিনাল বসাতে পাঁচ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে। সেই প্রস্তাবের প্রথম হচ্ছে ২০০৮ সালের পুরোনো জাহাজকে রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট ও ১ লাখ ৬৫ হাজার ঘনমিটারের মজুতক্ষমতা গড়ে তুলে ১৫ বছরের চুক্তি হলে সেই টার্মিনালকে দিনে চার্জ দিতে হবে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ডলার আর ২০ বছরের চুক্তি করলে দিতে হবে ৩ লাখ ২৬ হাজার ডলার।
২০১৬ সালের জাহাজকে টার্মিনালে পরিণত করে ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার মজুত সক্ষমতা গড়ে তুলে ১৫ বছরের চুক্তি করলে দিনে দিতে হবে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার, ২০ বছরের চুক্তি করলে ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার এবং ২৫ বছরের চুক্তি করলে ৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার। পেট্রোবাংলা ২০১৬ সালের মডেলের জাহাজকে গ্রহণ করে ১৫ বছরের চুক্তির সুপারিশ করেছে।
এ ব্যাপারে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি সিএনইই-এর সঙ্গে সমাঝোতায় পৌঁছে। সমাঝোতা অনুযায়ী ২০১৬ সালের মডেলের জাহাজকে টার্মিনাল বানিয়ে ১৫ বছরের জন্য চুক্তি করলে দিনে ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার দিতে হবে আর ২০ বছরের চুক্তি করলে ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার চার্জ দিতে হবে সিএনইইকে। এ দুইটির একটি চার্জ গ্রহণ করতে মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে সুপারিশ করা হয়েছিল।
প্রস্তাবে বলা হয়, এই ১৫ বছরের প্রস্তাব গ্রহণ করলে চুক্তিজুড়ে ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং ২০ বছরের চুক্তি করলে ১৩ হাজার ১৬১ কোটি টাকা দিতে হবে সিএনইইকে। পেট্রোবাংলা থেকে বলা হয়, এখনই অনুমোদন দেওয়া হলেও ২০২৮ সালের নভেম্বরের আগে তৃতীয় টার্মিনাল বসানো সম্ভব নয়। এর আগে সৌদির আরামকো ২৪-৩০ মাসের মধ্যে এই টার্মিনাল বসার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল।
মন্ত্রিসভা কমিটির এক সদস্য জানান, তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপন নিয়ে তথ্যের বেশ ঘাটতি আছে। বিশেষ করে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা না করে সিএনইইকে এই কাজ দেওয়া হচ্ছে। এর জবাবে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এফএসআরইউ বসাতে ২১টি কোম্পানি প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে জি-টু-জি পদ্ধতিতে ৫টি কোম্পানির প্রস্তাব যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু ওই পাঁচটি প্রস্তাব কোন কোন কোম্পানির এবং এর তুলনামূলক কোনো চিত্র মন্ত্রিসভা কমিটিকে জানানো হয়নি।
এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে জ্বালানি বিষয়ে চীন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) নেই। সিএনইই চীনের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। সেই হিসাবে চীনের ঢাকাস্থ দূতাবাস থেকে সিএনইই’কে কাজ দিতে একটি চিঠি দিয়েছে মাত্র। কোনো চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও সিএনইই-এর সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে চুক্তি করা যায় কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন।
একাধিক নীতিনির্ধারক বলেছেন, এলএনজি টার্মিনাল বসানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা সিএনইই-এর নেই। এ ব্যবসাও তাদের নেই। তারা আসলে অন্য কোনো কোম্পানিকে দিয়ে কাজ করাতে চায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সংসদ-সদস্যের নাতি এই কোম্পানির বাংলাদেশের স্থানীয় এজেন্ট। এখন আইন না মেনে যাকে-তাকে এফএসআরইউ-এর কাজ দিলে দেশ বিপাকে পড়তে পারে।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন প্রতিদিন কমছে।
