জ্বালানি ও এআই স্থাপনায় হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই নতুন হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, নতুন করে হামলা চালালে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত তেল স্থাপনা, সমুদ্র তলদেশের কেবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকির প্রেক্ষাপটে তেহরান এ প্রতিক্রিয়া জানাল।
শুক্রবার দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহেদি মোহাম্মাদির উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়। ইরানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেওয়া মেহেদি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নীতিগতভাবে হামলার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে তারা এ হামলার সফল পরিণতির নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা পরবর্তী সংঘাতকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসাবে দেখছি। দুই বছরের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ মানেই অস্তিত্ব সংকট। আমাদের কৌশল হলো-কোনো ‘রেড লাইন’ বা সীমাবদ্ধতা না রাখা। মেহেদি মোহাম্মাদি বলেন, ‘আমরা এ সংঘাতের সময়গত ও স্থানগত সীমানা ভেঙে ফেলব। শত্রুপক্ষ যা ধারণা করছে, তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে এবং অনেক বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে এ যুদ্ধ চলতে থাকবে।’
যুদ্ধ চলাকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে ইরানের পাশে থেকেছে চীন ও রাশিয়া। এবারও তেমনটা দেখা যেতে পারে। ইরানের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজাই ঘোষণা করেছেন-‘যুদ্ধ শুরু হলে কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুই নয়, বরং কেবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত অবকাঠামোগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। সংঘাত যদি আবারও ছড়িয়ে পড়ে, তবে আমাদের হাতে আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকবে।’
মেহেদি বলেন, ‘এমন কোনো পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না, যেখানে ইরানের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রগুলো আক্রমণের শিকার হবে, অথচ যে অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এসব আক্রমণগুলো চালানো হচ্ছে, তা অক্ষত ও নিরাপদ থেকে যাবে।’ মার্কিন গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা ইরানের ওপর নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার জন্য লক্ষ্যবস্তুর একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছেন। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
ইরান, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন সংকট একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে শুক্রবার ইস্তাম্বুলে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর ও তিনটি ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনে এখন নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা একটি সম্ভাব্য বাস্তবতা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর নৌবাহিনী দাবি করেছে, বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় তারা চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে একই সঙ্গে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির দাবি, প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণের ফলে আরও তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নতুন যৌথ হামলার আশঙ্কার খবর ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৩ দশমিক ৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।
গত চার মাসে ট্রাম্প সাতবার ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। তবে কূটনৈতিক আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা এখন একটি সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য হতে পারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, তেল স্থাপনা ও পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো। উভয়পক্ষের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দীর্ঘমেয়াদি যৌথ সামরিক মহড়া চালাচ্ছে, যার মধ্যে ইরাকের আকাশসীমায় অনুশীলনের ঘটনাও রয়েছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসর তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইসরাইলের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি উড়ে গেছে। এছাড়া, মধ্য ইরানের আরাক শহরে একটি বড় অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটির ভেতরে হয়তো কোনো অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম চলছে।
সোমবার নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা একটি যৌথ হামলার সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করেন; যার মধ্যে নেতানিয়াহুর পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনার ওপর এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জানুয়ারি মাসে নতুন কংগ্রেস বা সিনেট-যেখানে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বেশি থাকতে পারে-দায়িত্ব গ্রহণের আগেই, অর্থাৎ নভেম্বরের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, হাজার হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক আইনজীবী রেজা নাসরি বলেন, ‘যুদ্ধের তৃতীয় ঢেউ আর সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চলজুড়ে বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, তেল শোধনাগার ও বন্দরগুলো জ্বলতে থাকবে। কোটি কোটি মানুষ পানি ও বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়বে এবং আরব দেশগুলো থেকে ইউরোপের দিকে শরণার্থীদের এক বিশাল ঢল নামবে।’ তিনি বলেন, ‘হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়বে।’
