অস্ত্র হাতে মহড়ার ভিডিও
সাজেকের আন্দোলন ঘিরে পাহাড়ে অস্থিরতা
Advertisement
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি ও সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাজেকবাসীর দাবির সমর্থনে শনিবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলীতে মশাল মিছিল -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের আন্দোলন ঘিরে পাহাড়ে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে। জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। সাজেকে ২২ অক্টোবর অবরোধ চলাকালে ‘হামলা, লাঠিচার্জ এবং বাড়িঘর ও দোকান ভাঙচুরের’ প্রতিবাদে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় অর্ধবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।’ অন্যদিকে সাজেকে অব্যাহতভাবে চলছে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি।
শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অবরোধ চলাকালে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়।
এদিকে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও কারবারি অ্যাসোসিয়েশন নতুন করে বিবৃতি দিয়ে তাদের আগের তিন দফা থেকে এবার পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘এলাকা থেকে সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া, সাধারণ মানুষকে হুমকি বন্ধ, নিরাপত্তা নিশ্চিত, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং ঘরবাড়িতে তল্লাশি ও হয়রানি বন্ধ করা।’
অবরোধের কারণে শনিবার সকাল থেকে খাগড়াছড়ির সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল ছিল। খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলায়ও সড়কে যানবাহন চলাচল কম। অবরোধের সর্মথনে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের ফায়ার সার্ভিস এলাকায় টায়ারে আগুন দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পিকেটাররা। এ সময় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দৌড়ে পালায়। এছাড়া খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের বাইল্ল্যাছড়ি, পানছড়ি সড়ক এবং সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠের গুঁড়ি ও টায়ারে আগুন দেয় পিকেটাররা। এদিকে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের অবরোধ চলাকালে গতকাল এক সন্ত্রাসীকে অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে দেখা গেছে।
সেনাবাহিনীর মাটিরাঙা জোনের ড্রোন ভিডিওতে দেখা যায়-সড়কের ওপর আগুন জ্বলছে। আগুনের পাশ দিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে টহল দিচ্ছে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা দুটি মোটরসাইকেলে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ছিল। ড্রোনের উপস্থিতি টের পেয়ে মোটরসাইকেলে করে তারা গ্রামের ভেতরে ঢুকে যায়। অস্ত্র হাতে মহড়ার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অস্ত্র হাতে থাকা ওই ব্যক্তির নাম ও পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে অবরোধের কারণে আটকা পড়েছে অনেকে। ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী মো. বায়েজিদ বলেন, ‘আমি মাগুরা থেকে এসেছি। যাব মারিশ্যা। এসে শুনতেছি অবরোধ। ৫০ কিমি. দূরে কীভাবে যাব। খুব ঝামেলায় পড়েছি। কোনো গাড়ি পাচ্ছি না।’ স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ ত্রিপুরা বলেন, ‘আমি মাটিরাঙা যাব কিন্তু কোনো গাড়ি যাচ্ছে না। আমরা এ ধরনের অবরোধ চাই না। আমরা শান্তি চাই।’
এদিকে সাজেকে যেতে না পেরে তিন দিন ধরে আটকে আছেন পর্যটক দেওয়ান ঐশী। তিনি বলেন, ‘মূলত সাজেক যাওয়ার জন্য বুধবার খাগড়াছড়ি শহরে এসেছি। সাজেক বন্ধ থাকায় রাঙামাটি শহরে পৌঁছেও আবার খাগড়াছড়ি ফিরে এসেছি। আজকে শুনি এখানেও দুপুর পর্যন্ত অবরোধ। সাজেক যাওয়া হয়নি। অবরোধ শেষ হলে ঢাকায় চলে যাব।’
এদিকে অর্ধবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। অবরোধ চলাকালে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল করতে না পারলেও জেলা সদরসহ রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে এবং রাঙামাটি থেকে নৌপথসংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে যাত্রীবাহী লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করেছে।
এ সময় রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ওই রুটের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যানবাহন, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত ছিল।
এদিকে অব্যাহত সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ, উদ্বেগ ও জননিরাপত্তা সংকটকে কেন্দ্র করে অস্থির হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। নিরাপত্তার সংকট ও আতঙ্কে সাজেকের গঙ্গারাম এলাকার অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ভরমৌসুমে বন্ধ রয়েছে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র। ধস নেমেছে পর্যটননির্ভর ব্যবসায়। অর্থনৈতিক সংকটও তীব্র হয়ে উঠছে বলে জানান স্থানীয়রা। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার ও সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
২২ অক্টোবর সাজেকের গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় অবরোধ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি হয়। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। ঘটনার তদন্ত ও দায়ীদের শনাক্ত করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ঊষাতন চাকমা বলেন, ‘২২ অক্টোবর রাঙামাটির সাজেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি দেওয়া হয়। কর্মসূচি নির্ধারিত সময়ে শান্তিপূর্ণ ও সর্বাত্মক সফলভাবে পালিত হয়েছে। অবরোধের সমর্থনে রাঙামাটি জেলা সদরের সাপছড়ি, কতুকছড়ি, কাউখালী, নানিয়ারচর, বাঘাইছড়ির সাজেক ও মারিশ্যাসহ খাগড়াছড়ির বিভিন্ন রুটে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্বতঃস্ফূর্ত ও কঠোরভাবে পিকেটিং করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাজেকের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন সেখানকার আন্দোলনরত জনগণের দাবি মেনে নিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। এই ব্যর্থতা ঢাকতে ২২ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকারী জনগণের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা ও নির্বিচারে লাঠিচার্জসহ শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে এবং তথাকথিত ‘গোলাগুলি-সংঘর্ষের’ নাটক করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। হামলায় অন্তত ৭৮ জন নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ আহত হয়েছেন।’
রাঙামাটির কোতোয়ালি থানার ওসি জসীম উদ্দিন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন স্থানে পুলিশি টহল জোরদার ছিল। অবরোধের কারণে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। খাগড়াছড়ি সড়ক ছাড়া জেলার অন্য সব রুটে সড়ক ও নৌপথে যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করেছে।
সাজেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ অব্যাহত : এদিকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট-সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার কর্মসূচির তৃতীয় দিন সকাল থেকে মাচালং, শুকনাছড়িসহ সাজেকের স্থানে অবরোধের সমর্থনে পিকেটিং করা হয় বলে জানান স্থানীয়রা। তিন দফা দাবিতে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ২২ অক্টোবর থেকে সড়কটিতে অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে।
পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেখানে নিরাপত্তাজনিত কারণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় বন্ধ রয়েছে সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র। ফলে ওই সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করছে না এবং সাজেক পর্যটকশূন্য রয়েছে। বরাবরের মতো জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে।
আন্দোলনসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানান সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা। তারা বলেন, এর আগে গত ১১ ও ১৫ অক্টোবর অবরোধ করা হলেও প্রশাসনের আশ্বাসে এবং দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে সাময়িক স্থগিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়ায় ২২ অক্টোবর থেকে তারা পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অবরোধ কর্মসূচি শুরু করলে তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলাকালে আন্দোলনকারীদের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা, লাঠিচার্জ, বাড়িঘর-দোকান ভাঙচুর এবং পরে মিথ্যা মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তারা বলেন, ‘এবার আমরা পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছি।’
বাঘাইছড়িতে মশাল মিছিল : নিজেদের দাবির সমর্থনে সন্ধ্যায় বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলীতে মশাল মিছিল করেছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। মিছিলের পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন যুব প্রতিনিধি রত্ন জ্যোতি চাকমা ও সমাজসেবক লক্ষ্মী চাকমা।
