চার দিনের সফরে জাপানে প্রধানমন্ত্রী
২৫০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তির সম্ভাবনা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন এবং বাজেট সহায়তায় প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ৫ থেকে ৮টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ১২টি অগ্রাধিকার খাতে ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাবও দেবে ঢাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে রোববার রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর সফরে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও দেশটির বড় কোম্পানি ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন করবেন।
এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এবারের সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওই বৈঠকে এশিয়াজুড়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশ।
১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব : ২০২৬-২০৩১ সময়ে ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্ত ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিআইজি-বি) উদ্যোগের সঙ্গে। প্রস্তাবিত প্যাকেজে পরিবহণ ও নগর সংযোগে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়ীসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদনশিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর জন্য রাখা হয়েছে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতে আরও ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর সফরে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, পোশাক এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে একাধিক চুক্তি সই হতে পারে। এতে বাংলাদেশে নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
মাতারবাড়ী ও বিআইজি-বি উদ্যোগে গুরুত্ব : ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ঢাকা মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে দেশটির সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এবার মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগের (মিডি) মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেবে টোকিও।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ‘উন্মুক্ত ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয়’ (এফওআইপি) ভিশনের অংশ হিসাবে জাপান আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে চায়। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের অংশ হিসাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহলবোট দিয়েছিল দেশটি। অন্যদিকে মহেশখালী-মাতারবাড়ীতে জ্বালানি মজুতের অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করার কথা রয়েছে জাপানের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘জেরা’র (জেইআরএ)।
ঢাকা ও টোকিওর সূত্র অনুযায়ী, সফরে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা, অবকাঠামো, কৃষি, বেসামরিক বিমান চলাচল, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন, উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়ন, কোস্ট গার্ডের জন্য ওএসএ এবং জ্বালানি খাতে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) সই হতে পারে।
২০১৪ সালে চালু হওয়া বিআইজি-বি উদ্যোগের আওতায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডরে শিল্পের বিকাশ ঘটাতে চায় জাপান। ২০২৩ সালে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত করা হয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, কাল জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। আলোচনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার গুরুত্ব পাবে।
বিনিয়োগে গাড়ি ও উৎপাদনশিল্প : কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার বড় অংশ উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে। জাপানি গাড়ি নির্মাতা টয়োটা প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে বাংলাদেশে গাড়ি সংযোজন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশীয় সরবরাহকারীরা যন্ত্রাংশ ও কেবল তৈরির সুযোগ পেলে শক্তিশালী সহায়ক শিল্প গড়ে উঠতে পারে।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সদ্যবিদায়ি সভাপতি তারেক রফি ভূঁইয়া বলেন, সময়মতো জমি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ এবং শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা দূর করা গেলে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন সম্ভব। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে সস্তা শ্রমের পাশাপাশি দক্ষ প্রশাসন ও সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের অভিজ্ঞ প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষ যৌথ কর্মদল গঠনেরও পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের কর্মসূচি : প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। তিনি জাপানি ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সফরসূচি অনুযায়ী, আজ টোকিও পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশনের নেতাদের এবং জাইকার সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করবেন। সন্ধ্যায় নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন।
কাল জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন তিনি। পরে চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়া শহরে নিপ্পন এক্সপ্রেসের লজিস্টিক হাব পরিদর্শন করবেন।
বুধবার জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর, ইউনিক্লোর প্রেসিডেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং জেট্রোর সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করবেন। মিৎসুই, সুমিতোমো ও জেরার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার বৈঠকের কথা রয়েছে। জেট্রোতে বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরামে অংশ নিয়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত স্মারক সই প্রত্যক্ষ করবেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার টয়োটার একটি কারখানা পরিদর্শন শেষে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী : প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এছাড়া ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান, সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সফরসঙ্গী হিসাবে রয়েছেন।
