অগ্নিগর্ভ ফ্রান্স, পুড়ছে ইউরোপ
Advertisement
হাসান ইলিয়াছ তানিম, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফ্রান্সে গুলিতে নিহত মিক্সড মার্শাল আর্টস ফাইটার পেঙ্গো বসসিও ওয়াঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরব পদযাত্রা। রোববার প্যারিসে -এএফপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। শনিবার দেশজুড়ে ছাত্র ও শ্রমিকদের ডাকে ওই বিক্ষোভে সরকারি হিসাবে চার লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি-বিক্ষোভকারীদের প্রকৃত সংখ্যা আট লাখের বেশি। রোববার পর্যন্ত এ আন্দোলনে ১৩০০ বেশি ফরাসিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সংগঠকরা।
বিক্ষোভের কেন্দ্রে মূলত তরুণরা, নির্দিষ্ট করে বললে-জেনারেশন জেড বা জেন-জিরা। তাদের থেকে অনুপ্রাণিত আন্দোলন ইতোমধ্যে ইতালি, স্পেন, সার্বিয়া, পর্তুগাল, গ্রিস পর্যন্ত ছড়িয়েছে। উত্তাল হয়ে উঠেছে এসব দেশের রাজপথ। তাদের ক্ষোভে ইউরোপের ডজনখানেক দেশ এখন অগ্নিগর্ভ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, অতিরিক্ত খরচে নিুমানের শিক্ষা, আবাসন সংকট ও বাড়তি আবাসন ব্যয় নিয়ে মূলত এসব দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। কারণ বিভিন্ন হলেও ধরন একই-তরুণদের ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ। যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব দেশের জনগণ ও শিক্ষার্থীরা হতাশ ও বিক্ষুব্ধ।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেন-জিদের এসব হতাশা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারকে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের অধিকাংশ জায়গায় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও শনিবার রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী প্যারিস ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহের অশান্তির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ফ্রান্স২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদিন দেশজুড়ে বিক্ষোভে চার লাখ ১০ হাজারের মতো মানুষ অংশ নেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে দেশটির আন্দোলনকারীদের দাবি, এ বিক্ষোভে আট লাখের বেশি ফরাসি অংশ নেন। রোববার পর্যন্ত ১৩০০ বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৫০ পুলিশ কর্মকর্তা ও তিন বিক্ষোভকারী আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বিক্ষোভের মূল জমায়েত হয়। সেখানে অন্তত এক লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ এবং সমাজে বাড়তে থাকা বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন তারা। বিক্ষোভের ব্যাপকতা এবং একাধিক শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ফ্রান্সে চলমান অসন্তোষের বিস্তারকে সামনে এনেছে।
মার্সেইয়ে রাস্তা অবরোধ করতে যুবকরা আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেন। নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ও বোতল ছোড়া হয়। পুলিশ জানায়, শনিবারের বিক্ষোভের সময় অন্তত ৭৫ স্থানে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ২৪টি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
তবে এদিন বিক্ষোভ-সহিংসতায় ঠিক কতজন আহত হয়েছেন, সে তথ্য দেয়নি ফরাসি কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যেও। প্যারিসের বিলাসবহুল পোশাকের দোকান কিতোনের ম্যানেজার অস্কার বলেন, ‘দোকানে ক্রেতা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই দোকান খোলা রাখাটা আর বিশেষ লাভজনক বলে মনে হচ্ছে না।’
নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্যারিসের বেশ কয়েকটি সুপরিচিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শনিবারের জন্য বন্ধ রাখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে লুভর জাদুঘর, মুসে দ’র্সে জাদুঘর এবং প্যারিস অপেরা। ফলে শহরে আসা পর্যটকদেরও বিপাকে পড়তে হয়।
এর মধ্যে আগামী ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের আন্দোলনকারীরা।
বিক্ষোভে পুড়ছে ইউরোপ : ফ্রান্সে যে কারণে তুমুল বিক্ষোভ হচ্ছে; স্পেন, গ্রিস, সার্বিয়া বা পর্তুগালে বিক্ষোভের কারণটা আলাদা। স্পেনে বিক্ষোভের শুরু হয়েছে- ৮৭ বছরের মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা থেকে। এ ঘটনা দেশটিতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট আবাসন সংকট নিয়ে ক্ষোভ উসকে দিয়েছে।
আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। দেশটিতে বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের একটি পরিকল্পনা থেকে এ বিক্ষোভের শুরু হয়েছে। ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও জড়িত।
এক দেশের জেন-জি বিক্ষোভ অন্য দেশের তরুণদের রাজপথে নামতে অনুপ্রাণিত করেছে। ইতালি ও গ্রিসের তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাজপথের স্লোগানে ফরাসি বিক্ষোভকারীদের কথা বলেছেন এবং সংহতি জানিয়েছেন। স্পেনে আবাসন নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভের ঢেউ পর্তুগালেও ছড়িয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে বেলজিয়ামে। ফ্রান্স ও স্পেনে নতুন করে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। ‘জেন-জেড রেগেল্ট’ নামের একটি সংগঠন ৩১ অক্টোবর জার্মানিজুড়ে বিক্ষোভ করবে। শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।
ইউরোপীয় জেন-জিদের ক্ষোভের প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে-শিক্ষা ও আবাসন খাতের সংকট। এ ছাড়া ক্রমেই চাকরির বাজার অনিশ্চিত হয়ে পড়াও অন্যতম কারণ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) যেসব দেশে বিক্ষোভের উত্তাপ বেশি, সেগুলোর মধ্যে আছে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগাল। এসব দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। দেশগুলোর জাতীয় ঋণের পরিমাণও বেশি। ফলে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এথেন্সসহ গ্রিসের বিভিন্ন জায়গায় হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীরা এথেন্সে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে জড়ো হন। এ সময় তারা স্লোগান দেন, গ্রিস থেকে ফ্রান্স-আমরা বিনামূল্যের সরকারি শিক্ষা চাই। ইতালির রোমে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারী সিএনএনকে বলেন, সাশ্রয়ী আবাসনের সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এতদিনের জমে থাকা হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে। ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না-এমন অনুভূতি বিক্ষোভগুলোয় প্রতিফলিত হচ্ছে।
