Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

ক্ষতিগ্রস্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি

সার পেতে ডিলার পয়েন্টে কৃষকের নির্ঘুম রাত

Advertisement

আনু মোস্তফা

আনু মোস্তফা

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সার পেতে ডিলার পয়েন্টে কৃষকের নির্ঘুম রাত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিনোদপুর বাজারে সার সংগ্রহ করতে ডিলারের দোকানের সামনে কৃষকদের দীর্ঘ সারি। সম্প্রতি তোলা -যুগান্তর

Advertisement

দেশের যেসব জেলা কৃষিতে বেশি অবদান রাখে উত্তর-পশ্চিমের সর্বশেষ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ তার অন্যতম। বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০ হাজার কোটি টাকার আম ফলে। পাশাপাশি মাষকলাইর ডাল উৎপাদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শীর্ষ জেলা। এছাড়া আখ, সরিষা, ভুট্টা ও ধান উৎপাদনেও ছোট এই জেলার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি এই জেলার মানুষের প্রধান পেশা। হাল আমলে জেলার কৃষিতে বৈচিত্র্য এসেছে। স্ট্রবেরি, ড্রাগন, মালটা, পেয়ারা, কুল ও বারোমাসি আমসহ প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফল ও ফসল আবাদে ঝুঁকেছেন কৃষকরা।

সাম্প্রতিক তীব্র সার সংকটের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা খবরের শিরোনাম হচ্ছে বারবার। জেলার সর্বত্রই এক বস্তা সারের জন্য হাজার হাজার কৃষক ডিলার পয়েন্টগুলোতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। কেউ পাচ্ছেন আর অধিকাংশই ফিরছেন খালি হাতে। তবে জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন-চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের সংকট নেই। কিন্তু সরেজমিন দেখা গেছে, ডিলারের দোকানেও পর্যাপ্ত সার নেই। প্রশাসনের আরও দাবি, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।

সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১০ বছরেও চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ পাননি এই জেলার কৃষকরা। প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি-এই চার ধরনের সারের বার্ষিক চাহিদা ছিল ৮৭ হাজার ৪৩৩ টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ হয় ৬৬ হাজার ৬০ টন, যা চাহিদার তুলনায় ২৪ শতাংশ কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯০ হাজার ৬১১ টন চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ আসে ৬৬ হাজার ২২৪ টন। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ২৭ শতাংশ কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯৮ হাজার ৭৬৪ টন চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ আসে ৬৪ হাজার ৭৪০ টন, যেখানে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ এ ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৩১ টনের স্থলে বরাদ্দ মিলে ৭০ হাজার ৬৩১ টন, যা চাহিদার ৪৩ শতাংশ কম।

এদিকে ফসল আবাদ বহুমুখীকরণের কারণে ২০২৩-২৪ বছরে জেলায় সারের চাহিদা বেড়ে ২ লাখ ১১ হাজার ৫৮৫ হলেও বরাদ্দ হয় মাত্র ৯৯ হাজার ৮৮৬ টন। এই বছরেও ৫৩ শতাংশ কম সার আসে। ২০২৪-২৫ বছরে চাহিদা আরও বেড়ে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০০ টনে দাঁড়ায়। বিপুল চাহিদার বিপরীতে এ বছরেও মাত্র ৩৬ শতাংশ সার পান কৃষকরা। ২০২৫-২৬ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সারের চাহিদা পাঠানো হয় ২ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ টন। বিপরীতে বরাদ্দ আসে মাত্র ৯৮ হাজার ৮৩২ টন। বিগত ১০ বছরের মধ্যে এ বছর সার ঘাটতি হয়েছে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ।

এদিকে চাহিদার তুলনায় সারের বরাদ্দ কম হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে কালোবাজারে সার বিক্রি বন্ধ করতে পারেনি প্রশাসন। জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ডিলার পয়েন্টে গিয়ে চার দিন ঘুরেও এক বস্তা সার পাইনি। কিন্তু চরের হাটগুলোতে মুদি দোকানে ১ হাজার ৫০ টাকা বস্তার ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকায়। শিবগঞ্জের হাজারবিঘির কৃষক হাফিজুর রহমান জানান, রাত ১২টার পর থেকে কৃষকরা ডিলারের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। নির্ঘুম রাত কাটিয়েও সার না পেয়ে ফিরছেন খালি হাতে। চৌকা গ্রামের কৃষক শফিকুল জানান, সরিষার জমি তৈরি করে বসে আছেন দুই সপ্তাহ ধরে। সার না পাওয়ায় জমিতে বীজ বপন করতে পারছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সর্বত্রই তীব্র সার সংকট চলছে। গোমস্তাপুরের চরনা গ্রামের কৃষক দুরুল হোদা বলেন, তিন দিন লাইনে দাঁড়িয়েও এক বস্তা সার পাইনি। কৃষি অফিসে দেখা করলে কর্মকর্তারা উপদেশ দিচ্ছেন জমিতে সার বেশি দিবেন না। তিনি জানান, পাঁচ বিঘা জমিতে আলু আবাদের কথা ভাবছিলেন। সারের ব্যবস্থা না হওয়ায় সেই চিন্তা বাদ দিয়েছেন। শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও সদরের বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে সারের জন্য হাহাকার করছেন কৃষকরা। সার না পেয়ে ডিলারের দোকানে হামলার ঘটনাও ঘটেছে একাধিক স্থানে। ডিলার পয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও আনসার মোতায়েন করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলে ডিলাররা নিজ নিজ এলাকার কৃষি অফিসে অভিযোগ করেছেন।

ভুক্তভোগী কৃষকদের আরও অভিযোগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গত কয়েক বছর ধরে সারের সিন্ডিকেটবাজি চলছে। প্রশাসন এসব ক্ষেত্রে বরাবরের মতো উদাসীন। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সারের সঙ্কট নেই বলে দাবি করলেও এই জেলায় সার বরাদ্দে বিপুল ঘাটতির কারণেই কৃষক অসন্তোষ চলছে-বলছিলেন কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুস সামাদ।

জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিসিআইসির ৫৮ জন ও বিএডিসির ৩৮ জন অনুমোদিত সার ডিলার রয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার ডিলার সমিতির সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ বেশ কম। এই বরাদ্দে কৃষকদের সারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। কৃষিপ্রধান এলাকা হিসাবে জেলায় সারের বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।

কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ আসছে। কিন্তু কৃষকরা চলতি আবাদের পাশাপাশি আগামী আবাদের জন্য আগাম সার সংগ্রহ করছেন। আগামীতে সার পাওয়া যাবে না এমন আশঙ্কা থেকে কৃষকরা বেশি করে সার কিনছেন। এর ফলে বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দের সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

এইচএসসিতে ২২ বছরে সর্বনিম্ন পাশের হার ইংরেজি আইসিটিতে বিপর্যয়

ইংরেজি আইসিটিতে বিপর্যয়

এলডিসি উত্তরণ : সময় মাত্র তিন বছর পাঁচ স্তরের জাতীয় রোডম্যাপ চূড়ান্ত

পাঁচ স্তরের জাতীয় রোডম্যাপ চূড়ান্ত

নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি আঞ্চলিক গ্রিড চায় বাংলাদেশ

আঞ্চলিক গ্রিড চায় বাংলাদেশ

ক্ষতিগ্রস্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সার পেতে ডিলার পয়েন্টে কৃষকের নির্ঘুম রাত

সার পেতে ডিলার পয়েন্টে কৃষকের নির্ঘুম রাত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম