এইচএসসিতে ২২ বছরে সর্বনিম্ন পাশের হার
ইংরেজি আইসিটিতে বিপর্যয়
শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপালে হবে না -শিক্ষামন্ত্রী * মেধার মূল্যায়ন হয়েছে -অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে গত ২২ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। পাশের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে; যা গত বছরের চেয়েও ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে খারাপ ফল, অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের চাপ, ঘনঘন পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে এবার ফলাফলে ধস নেমেছে। শনিবার প্রকাশিত ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে দেখা যায়, মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জনই ফেল করেছেন, যার বড় অংশই মানবিক শাখা ও গ্রামাঞ্চলের। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় ২৯ হাজার ১৩ জন কমে এবার দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জনে। পাশের হার, জিপিএ-৫, শতভাগ পাশ করা প্রতিষ্ঠান-সব সূচকেই নেতিবাচক ফল হয়েছে; বিপরীতে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৩টিতে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজিতে ফেল করেছেন মোট পরীক্ষার্থীর ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এ বিষয়ে ফেলের হার গত বছরের চেয়ে ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে আইসিটিতে ফেল করেছেন ২৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এছাড়া বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় ২৭ শতাংশ, বাণিজ্য বিভাগে ৪৯ শতাংশ, মানবিক বিভাগে প্রায় ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। এর আগে ২০০৫ সালে এইচএসসিতে পাশের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই পাশের হার বেড়েছে বা সামান্য কমবেশি হয়েছে। কিন্তু এবার সব ওলটপালট হয়ে গেল।
শনিবার সকালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসিসহ (বিএম) মোট ১১ বোর্ডের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এবারও ছাত্রদের চেয়ে ৬৬ হাজার ৩৭১ জন ছাত্রী বেশি পাশ করেছেন। তবে ছাত্রীদের চেয়ে ৬৪২ জন ছাত্র বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এবার সবচেয়ে বেশি পাশের হার ঢাকা বোর্ডে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে বরিশাল বোর্ডে। পাশের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। অনেক শিক্ষার্থী বড় সিলেবাসের কারণে চাপে পড়েন। পাশাপাশি গতানুগতিক ধারার বাইরে অভিন্ন ও মানসম্মত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ায় অনেকের ফলাফলে প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হন। ওই সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এর প্রভাবেও অনেক শিক্ষার্থী কলেজবিমুখ হয়ে পড়েন এবং পড়াশোনায় উদাসীন থাকেন।
পাশের হার কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ফলাফলের এমন পতন কখনোই প্রশংসনীয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন, পাঠদান পদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা ও শিক্ষার পরিবেশে নানা ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপালে হবে না। শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও কার্যকর পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ফলাফলের উন্নতি করতে হলে বিদ্যমান ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, এ বছর পাশের হার কমলেও প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হয়েছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল-কলেজে আসার আগ্রহ কমে গেছে। শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি ও পড়াশোনায় অনাগ্রহের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ফলাফলে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে ফিরিয়ে আনা এবং পাঠ্যবিষয় মুখস্থ করার পরিবর্তে ভালোভাবে বোঝার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
অবশ্য ফল বিশ্লেষণে পাশের হার কমে যাওয়ার পেছনে আরও দুটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। এর একটি হচ্ছে, মানবিকে পাশের হার কমে যাওয়া। অন্যটি হলো, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক খারাপ ফল। এবার সর্বমোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। এর মধ্যে পাস করেছেন ছয় লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ফেল করা শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই গ্রামাঞ্চলের এবং সুবিধাবঞ্চিত অভিভাবকের সন্তান।
ফলাফল অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে শতভাগ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা হয়েছে। অতীতে পাশের হার ও জিপিএ-৫ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধার সঠিক মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো পরীক্ষার্থীদের খাতার পূর্ণাঙ্গ পুনর্নিরীক্ষার সুযোগও চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে যেন একটি বছর নষ্ট না হয়, সেজন্য সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার আয়োজন করা হবে।
শনিবার বেলা ১১টায় স্ব স্ব বোর্ডে ফল প্রকাশ করা হয়। এদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ফলাফলের সার-সংক্ষেপ তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। এর মধ্যে শিক্ষার্থীরা কলেজ, মাদ্রাসায় গিয়ে ফল জানতে পেরেছেন। এছাড়া অনলাইন এবং এসএমএসেও শিক্ষার্থীরা ফল জেনেছেন। ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন রিমন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব কেরামত আলী প্রমুখ।
এদিন এইচএসসির সঙ্গে মাদ্রাসার আলিম এবং কারিগরি বোর্ডের এইচএসসির (ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা) ফলও প্রকাশ করা হয়। এবার শুধু এইচএসসির নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৪৮ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাশের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৬ হাজার ৭১৪ জন, বরিশাল বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুই হাজার ৯২৯ জন, কুমিল্লায় পাশের হার ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন এক হাজার ৩১৩ জন, রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন চার হাজার ৫২০ জন, সিলেট বোর্ডে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন এক হাজার ২০৪ জন, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুই হাজার ৯৫৩ জন, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ আর জিপিএ-৫ পেয়েছে দুই হাজার ১৩৭ জন ও যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিন হাজার ২২৮ জন। এই নয়টি বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। পাশ করেছেন পাঁচ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। এছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে পাশের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। এই বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিন হাজার ২৫০ জন। এতে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ৮৯ হাজার ৩২১ জন। পাশ করেছেন ৫৪ হাজার ৫৪৭ জন। কারিগরি বোর্ডে পাশের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৮৬ জন। এতে মোট পরীক্ষার্থী ছিল এক লাখ দুই হাজার ৯৪৭ জন। পাশ করেছেন ৫০ হাজার ৮৮৯ জন। মোট ১১টি বোর্ডে শুধু ইংরেজিতে ফেল করেছেন দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। আর আইসিটিতে ফেল করেছেন এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে ফেল করেছেন প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী।
ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ইংরেজিতে গড়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এ বিষয়ে বেশি পাশের হার ঢাকা বোর্ডে, আর সবচেয়ে কম বরিশাল বোর্ডে ৫৪ দশমিক ০৪ শতাংশ। এছাড়া আইসিটি বিষয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পাশের হার। এই বিষয়ে বোর্ডগুলোর গড় পাশের হার ৭১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এতে ২৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে বোর্ডগুলোর পাশের হার তৃতীয় সর্বনিম্ন। এছাড়া ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে বরিশাল বোর্ডে। পাশের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এই বোর্ডে ইংরেজিতে পাশের হার ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা সারা দেশে সর্বনিম্ন।
২২ বছরে সর্বনিম্ন ফল : বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুসারে, ১৯৯৬ সালে সর্বনিম্ন ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছিলেন। এরপর ২০০৫ সালে এইচএসসিতে পাশের হার ছিল ৫৯ শতাংশের বেশি। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৬৪ শতাংশের উপরে, ২০০৮ সালে প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে তা কমে যায় ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশে। এর পরবর্তী বছরগুলোয় পাশের হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। শুধু তিন বছর (২০১৫, ২০১৭ ও ২০১৮) ৭০ শতাংশের নিচে নেমেছিল।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সরাসরি পরীক্ষা হয়নি, ফলে ‘বিশেষ প্রক্রিয়ায়’ সবাই উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০২১ ও ২০২২ সালে ভিন্ন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় পাশের হার ছিল এক বছর ৮৪ শতাংশের বেশি, আরেক বছর ৯৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু ২০২৩ সালে তা আবার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। ২০২৪ সালে পাশের হার ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৫ সালে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ-বড় পতনের পর এবারও নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকল।
এইচএসসির ফল চ্যালেঞ্জে আবেদন শুরু আজ : এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় যারা ফেল করেছেন বা কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি, তাদের জন্য ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে। ফল পুনঃনিরীক্ষণে তাদের আবেদন আজ থেকে শুরু হবে। চলবে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রতি পত্রের ফল পুনঃনিরীক্ষার ফি ১৫০ টাকা।

