২০২৬-২০২৯ মেয়াদি রোডম্যাপ সরকারের
টেকসই এলডিসি উত্তরণে পাঁচ পক্ষ নিয়ে সংস্কার
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে দেওয়া বাড়তি তিন বছর অর্থনীতির আমূল পরিবর্তনের সুযোগ হিসাবে কাজে লাগানো হবে। এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগের অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, রপ্তানিপণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার তৈরিতে ব্যাপক সংস্কার করা হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দেশের জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা-এই পাঁচ পক্ষকে একসঙ্গে যুক্ত করছে সরকার। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির মেয়াদ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদিত হয়। ওই বাড়তি তিন বছর কাজে লাগাতে ২০২৬-২০২৯ মেয়াদি সংস্কার রোডম্যাপ তৈরি করেছে সরকার। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, শিল্প উৎপাদনশীলতা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ এতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাশেদ তিতুমীর বলেন, শুধু এলডিসি থেকে উত্তরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করাই সরকারের লক্ষ্য নয়। বরং উত্তরণের পরও যাতে অর্থনীতির গতি ব্যাহত না হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে না যায় এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি আসে-সেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসাবে গড়ে তুলতে চান। লক্ষ্য ‘গ্র্যাজুয়েশন থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে’ রূপান্তর করা।
পাঁচ পক্ষের অংশীদারত্বে সংস্কার : স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় অর্থনীতির। ফলে অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তিতুমীর বলেন, এ সংস্কার কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এ কারণে পাঁচ পক্ষকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পাঁচ পক্ষ হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা। উপদেষ্টার মতে, এ ধরনের সর্বসম্মত অংশীদারত্বের উদ্যোগ আগে দেখা যায়নি। জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সংস্কার বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পাঁচ পক্ষের অংশগ্রহণে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের পথ তৈরি হবে। রাশেদ তিতুমীর বলেন, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে প্রতিটি আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা বা কম্প্যাক্ট গড়ে তুলতে পারলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। এটি সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশলেরও অংশ। জাতিসংঘের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী জাতিসংঘ বাংলাদেশকে কারিগরি সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে। এ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেবেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক। পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচিতে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)। আইএমএফ-এর চলমান কর্মসূচির সঙ্গে অন্যান্য সংস্কার উদ্যোগের সমন্বয়ও রাখা হচ্ছে।
কেন বাড়তি তিন বছর প্রয়োজন : প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে রাশেদ তিতুমীর বলেন, সরকার শুরু থেকেই এলডিসি উত্তরণের পক্ষে। তবে উত্তরণ যেন অর্থনীতির জন্য নতুন সংকট তৈরি না করে, সেজন্য বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি সময় চাওয়া হয়েছে। সংস্কারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা না গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা কঠিন হবে। জ্বালানি নিরাপত্তাকেও টেকসই শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসাবে দেখছে সরকার। এ লক্ষ্যে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। কারণ, উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারসহ এলডিসি হিসাবে পাওয়া কিছু বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে।
