৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে দিনভর আন্দোলন
বিক্ষোভ সহিংসতা তাণ্ডব
পুলিশের গাড়ি ও বক্স, কারখানা, ব্যাংক ভাঙচুর-আগুন * ওসিসহ আহত ৩০ * অবরোধে সড়কে দিনভর দুর্ভোগ * তিন ঘণ্টা বন্ধ মেট্রো স্টেশন
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পুলিশের সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের সংঘর্ষের মাঝে পড়েন স্কুল থেকে সন্তানকে নিয়ে বাড়ি-ফিরতি এক মা। ইটপাটকেল থেকে সন্তানকে রক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে ছুটছেন তিনি -সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলগুলো শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। সকাল থেকে এসব এলাকায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় পালটাপালটি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। শ্রমিকরা বিক্ষোভের নামে পুলিশের গাড়ি, পুলিশ বক্স ও কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালান। জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পুলিশের ধারণা, সাধারণ শ্রমিকদের এই আন্দোলনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অনুপ্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে নাশকতা ও লুটপাটের অপচেষ্টা চালাচ্ছে; ইতোমধ্যে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
এদিকে অবরোধে থমকে যায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিশেষ করে ক্লাস বা পরীক্ষার উদ্দেশে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের চরম অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়। সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হন অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহনে থাকা রোগীরা। এছাড়া কর্মজীবী মানুষ ও জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া পথচারীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র পরিবহণ সংকটে আটকে থেকে অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সকাল ৯টায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবরোধ দিয়ে শুরু হওয়া কর্মসূচি একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। পুলিশ বারবার অনুরোধ জানিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীরা অনড় থাকেন। পরে ইটপাটকেল ছোড়া হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ারশেল, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। দুপুরে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হলে পুড়ে যায় মেট্রোরেলের পানির লাইন; নিরাপত্তার স্বার্থে আড়াইটা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয় মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন। আগুন নেভাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও, ইটের আঘাতে আহত হন গাড়িচালক।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত টানা ৭ ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় একটি কারখানার ঝুটের গোডাউন, পিকআপ ভ্যান, প্রাইভেটকার ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়; ভাঙচুর করা হয় ব্যাংক, কারখানার গেট ও পুলিশ বক্স। সংঘর্ষে কালিয়াকৈর থানার ওসি ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে রোববার ১৩০টির বেশি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণার খবর পাওয়া গেছে। তবে বিজিএমইএ সূত্র জানায়, এদিন ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। যুগান্তর প্রতিবেদন ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষে মিরপুরে রণক্ষেত্র : সকাল ৯টায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধ করেন শ্রমিকরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিরপুর-১১, ১২ ও প্রশিকা মোড়সহ আশপাশের সড়কেও অবস্থান নেন তারা। এতে বন্ধ হয়ে যায় এসব এলাকার যান চলাচল। পুলিশ আন্দোলনকারীদের বুঝিয়ে প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেন শ্রমিকরা। পরে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে শুরু হয় ধাওয়া-পালটাধাওয়া ও সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বেশকিছু আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় গ্রেফতাররা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে থাকা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন তারা। এতে মেট্রোরেলের পানির লাইন পুড়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় স্টেশনের প্রবেশপথ। এই ঘটনায় দুপুর ১২টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয় মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন। এতে পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়।
স্টেশনের নিচে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট। তবে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই আন্দোলনকারীদের হামলার মুখে পড়েন ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ইটপাটকেলের আঘাতে গাড়িটির সামনের উইন্ডশিল্ড ও দুই পাশের লুকিং গ্লাস ভেঙে যায়। ভাঙা কাচের আঘাতে আহত হন গাড়িচালক।
ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ : এমন পরিস্থিতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। কোথাও হেঁটে, কোথাও বিকল্প পথ খুঁজে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন তারা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। স্কুল থেকে মেয়েকে আনতে রাস্তায় বের হওয়া মো. শাওন নামের এক ব্যক্তি যুগান্তরকে বলেন, মিরপুর-১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে হিড স্কুলে আমার মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ওকে আনতে যাচ্ছি। রিকশা নিয়ে যেতে পারছি না। তাই হেঁটে রওয়ানা দিয়েছি। স্কুলে ফোন দিচ্ছি, কেউ ফোন ধরছে না। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না।
মিরপুর-১২ থেকে শাহবাগের উদ্দেশে হেঁটে রওয়ানা হওয়া আরিফুল ইসলাম বলেন, রাস্তায় গাড়ি নেই। ভেবেছিলাম মেট্রো দিয়ে চলে যাব। আগুনের ঘটনার পর মেট্রো স্টেশন বন্ধ। এখন নির্ধারিত স্থানে যেতে বিকল্প কিছু পাচ্ছি না। তাই বাধ্য হয়ে হেঁটে রওয়ানা দিয়েছি।
ডিএমপির ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজল হক বকশী দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।
গাজীপুরে ঝুটের গোডাউন ও পিকআপে আগুন : সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত টানা ৭ ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। এতে এই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহণ শ্রমিকরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক ও বিভিন্ন কারখানার গেট, মৌচাকে পুলিশ বক্স ভাঙচুর এবং কোনাবাড়ী পুলিশ বক্স ও আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা তারেকুল ইসলাম জানান, ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটের গোডাউনে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে মহাসড়কে তীব্র যানজটের কারণে তারা প্রথমে পৌঁছাতে পারেনি। পরে বিজিবির পাহারায় মহাসড়কের বিপরীত দিক দিয়ে ঘটনাস্থলে যায়।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পৌঁছালে আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটপাটকেলে তিনি গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
সকালে কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পর তারা বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের আন্দোলনের কারণে আশপাশের বিভিন্ন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এক সপ্তাহ দায়িত্ব পালন করবেন।
আশুলিয়ার নরসিংহপুর থেকে হেমায়েতপুর : সকালে নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, ট্রাউজার লাইন লিমিটেড ও নিউএজ গ্রুপের একটি কারখানায় কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিকরা। কারখানায় উপস্থিত হলেও কাজে যোগ দেননি তারা। একপর্যায়ে শ্রমিকদের একটি অংশ বাইরে বেরিয়ে এলে আশপাশের কারখানাগুলোতেও অসন্তোষের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বেলা ১১টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কে জড়ো হন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। পুলিশ প্রথমে তাদের বুঝিয়ে সড়কের পাশে সরিয়ে দেয়। তবে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আবার মহাসড়কে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিপাকে পড়েন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রী ও পরিবহণ শ্রমিকরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে আন্দোলনরত শ্রমিকরা নরসিংহপুরে শারমিন গ্রুপের পোশাক কারখানার সামনে অবস্থান নেন। তারা আশপাশের কারখানাগুলোর শ্রমিকদেরও আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকলে নিশ্চিন্তপুর, নরসিংহপুর, ছয়তলা ও কাঠগড়া এলাকার একের পর এক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। রোববার দুপুর পর্যন্ত আশুলিয়ায় অন্তত ৫০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেন গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ।
এদিকে আশুলিয়ার আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়ে সাভারের হেমায়েতপুরেও। দুপুরের পর সেখানকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের সড়কে নেমে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়। বিকালের দিকে একে এইচ গ্রুপের অন্তত দুই হাজার পোশাক শ্রমিক ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নেন। এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিক ও একেএইচ মালিকপক্ষের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকরা ক্ষিপ্ত হয়ে কারখানার ভেতরে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে।
