রেকর্ড ভেঙে ফেল ৫ লাখ ৯৪ হাজার শিক্ষার্থী
সামনে এলো শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকট
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে। এবার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ শিক্ষার্থী। ১৯৯০ সালের পর গত ৩৬ বছরে এক বছরে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কখনো ফেল করেননি। এবার পাশের হারও কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত বছরের তুলনায় কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। শিক্ষার্থীদের এই ফলাফল শিক্ষার মান, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষকদের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতিই কি এর প্রধান কারণ, নাকি প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতির প্রতিফলন ঘটেছে পরীক্ষার ফলে?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাশের হারের হিসাবে এবার দ্বাদশ সর্বনিম্ন অবস্থানে। এর আগে ১৯৯৬ সালে পাশের হার ছিল সবচেয়ে কম, ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ২০০২ সালে ২৭ দশমিক ০৯ এবং ২০০১ সালে ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছিলেন। তবে এবার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০২৫ সালে পাঁচ লাখ ৮ হাজার, ২০১৮ সালে চার লাখ ৩৭ হাজার, ২০১৭ সালে তিন লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০১৯ সালে তিন লাখ ৪৮ হাজার শিক্ষার্থী ফেল করেছিলেন। সেই হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৮৬ হাজার এবং ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় এক লাখ ৫৭ হাজার বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, এর পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি দায়ী নয়। প্রাথমিক স্তর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। সেই ঘাটতি নিয়েই তারা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে উঠছে। পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষকদের পাঠদানে অনাগ্রহ এবং কোচিংনির্ভর পড়াশোনা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বাড়তি সহায়তার ব্যবস্থাও নেই। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটও প্রকট।
এবারের ফলাফল নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পাশের হার বাড়ানো শিক্ষার মানোন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য।
শিক্ষাবিদ ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, এবারের ফলাফল বিপর্যয় নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। প্রাথমিক থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকেও কাটছে না। পরীক্ষার ফলে এরই প্রতিফলন ঘটেছে।
শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, এ সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নও করতে হবে। শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফেরানো, পাঠদানের মান বাড়ানো এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য একটি শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান সরকার বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ চলছে। নতুন কারিকুলাম তৈরিসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে-শুধু নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করলেই শিক্ষার মান বাড়বে না। এর যথাযথ বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত ক্লাস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কোন পর্যায়ে, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
