যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন আজ
অগ্নিপরীক্ষায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ৭ অঙ্গরাজ্যের সবকটিতে এগিয়ে ডেমোক্র্যাট
Advertisement
শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এ নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, দলীয় প্রচার ও ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে আগামী দুই বছর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণের ভবিষ্যৎ। বিশ্লেষকদের অনেকে এটাকে মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসাবে বর্ণনা করছেন।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ যুদ্ধের জেরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে নজিরবিহীনভাবে দ্বিগুণ হয়েছে। দেশে দেশে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি, ধুঁকছে অর্থনীতি। ভোটে হারলে ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারিতায় লাগাম টানা হতে পারে।
এটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের মাধ্যমে এ নির্বাচন হোয়াইট হাউজের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রশাসনের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় ও আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে। তবে প্রতিনিধি পরিষদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সংকীর্ণ। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। অন্যদিকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন।
ডেমোক্র্যাটদের প্রধান লক্ষ্য প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করছে দলটি। নির্বাচনি বিশ্লেষকদের নজর রয়েছে কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের দিকে, যেসব আসনের ফলাফল কংগ্রেসের ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তন করতে পারে। সিনেট নির্বাচনে ওহাইও, আইওয়া, টেক্সাস, আলাস্কা, মিশিগান ও মেইনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের লড়াই শেষ পর্যন্ত সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে : যুক্তরাষ্ট্রে দুই বছর পর পরই মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়। কিন্তু বিশ্লেষকরা এবারের নির্বাচনকে মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে দেখছেন। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সাতটি অঙ্গরাজ্যের প্রায় সবকটিতেই রিপাবলিকানদের চেয়ে এগিয়ে আছে ডেমোক্র্যাটরা। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, টেক্সাস ও কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। ১৯৮৮ সালের পর টেক্সাসে ও ১৯৩২ সালের পর কানসাসে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।
১০০ সদস্যের সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের বর্তমানে নিজেদের দখলে থাকা সব আসন ধরে রাখতে হবে এবং রিপাবলিকানদের দখলে থাকা অন্তত চারটি আসন নিজেদের দখলে নিতে হবে। এ লড়াই এতটা সহজ হবে না। কারণ, ডেমোক্র্যাটদের যেসব আসনে জয় পেতে হবে, তার অধিকাংশই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। নতুন জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে রিপাবলিকান সিনেটর রয়েছেন-এমন পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। আর ষষ্ঠ অঙ্গরাজ্যটিতে দুই দলের প্রার্থীর অবস্থান প্রায় সমান।
অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে কানসাস, মেইন, ওহাইও ও টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে রয়েছেন। আলাস্কায় ব্যবধান খুবই সামান্য। অন্যদিকে আইওয়ায় দুই দলের প্রার্থীর মধ্যে কার্যত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এবার নির্বাচন হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা এমন একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনটি মিশিগানে। জরিপের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, দলটির প্রার্থী রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১১ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। তবে জরিপটি করা হয়েছিল সপ্তাহান্তে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিরোধ শুরুর আগে। এ অবস্থায় মিশিগানের দিকে চোখ পুরো বিশ্বের। সেখানে ডেমোক্র্যাট আব্দুল এল-সায়েদ লড়ছেন রিপাবলিকান মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে। বিজয়ী হলে তিনি হবে মার্কিন সিনেটে প্রথম কোনো মুসলিম প্রতিনিধি। তবে বাগড়া বাধিয়েছেন হেলি স্টিভেন্স। মিশিগানের এ ডেমোক্র্যাট নেত্রী প্রাইমারিতে এল-সায়েদের কাছে হেরে যান। শেষ মুহূর্তে রোববার তিনি বিরোধী রিপাবলিকান প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানান। দলের এ বিভাজন ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে-তা ফলাফল থেকে জানা যাবে। এছাড়া টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো সাত পয়েন্টে প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে আছেন।
নতুন জরিপে নর্থ ক্যারোলাইনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এগিয়ে আছেন। এ কারণে রিপাবলিকানরা সেখানে তাদের নির্বাচনি প্রচারের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ এবং অর্থনীতি পরিচালনায় তার ভূমিকা নিয়ে ভোটের মধ্যে হতাশা রিপাবলিকানদের পিছিয়ে দিচ্ছে। জরিপে অন্তর্ভুক্ত সাতটি অঙ্গরাজ্যের সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এ হার বেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সোমবার বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বহু ভোটারের কাছে এবার অর্থনীতিই প্রধান ইস্যু-যারা জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার উচ্চমূল্যের কারণে ভোগান্তিতে আছেন। মুদ্রাস্ফীতি দেশটির ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত লক্ষ্যের উপরে রয়েছে, যার একটি কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ। ভোটাররা অভিবাসন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইস্যু নিয়েও আগ্রহী।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কোন রাজনৈতিক দল- ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল না বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করবে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তার নিজের জন্য কতটা সহজ হবে। সে সঙ্গে মার্কিনিরা প্রেসিডেন্টের ওপর কতটা সন্তুষ্ট তা-ও বোঝা যাবে।
আমি আবারও নির্বাচনে লড়তে চাই-ট্রাম্প : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সংবিধান অনুমতি দিলে তিনি আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পছন্দ করবেন। নিউইয়র্ক পোস্টের ‘পড ফোর্স ওয়ান’ পডকাস্টে মিরান্ডা ডিভাইনকে ট্রাম্প বলেন, ‘সুযোগ পেলে আমি আবারও নির্বাচনে লড়তে চাইবো; তবে সংবিধানের ভাষা এ বিষয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।’ শুক্রবার ধারণ করা ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আবারও নির্বাচনে লড়তে চাই। কিছুদিন আগে একটি জনমত জরিপ হয়েছে, যেখানে আমি অন্যদের চেয়ে অনেক বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলাম। আমি আবারও লড়তে চাই। তবে কোনো সমস্যা নেই; আমাদের হাতে এখনো দুই বছরেরও বেশি সময় আছে। এটি অনেক দীর্ঘ সময়। এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছু করা সম্ভব।’ মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি দুই বারের বেশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। গত মাসে আইওয়া অঙ্গরাজ্যে এক জনসভায় ট্রাম্প বলেন, তিনি মনে করেন তার ‘আবারও নির্বাচনে লড়ার অধিকার আছে। কারণ, তারা কারচুপি করেছে।’ তখন ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় আইনে বলা আছে-যদিও আমি শতভাগ নিশ্চিত নই-তবে সম্ভবত আইন অনুযায়ী আমার আবারও নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখেছি।’
