Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

পোশাক খাত নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন

অস্থিরতার নেপথ্যে আ.লীগ

Advertisement

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অস্থিরতার নেপথ্যে আ.লীগ

Advertisement

তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতার নেপথ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পতিত আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী এবং কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা। রোববার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। ওই ঘটনা ও দায়ীদের বিস্তারিত পরিচয়সংবলিত প্রতিবেদন সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কাছে রয়েছে। জড়িতদের অনেককে গ্রেফতার ও বাকিদের নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত ডিসেম্বর মাসকে টার্গেট করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসাবে পরিচিত গার্মেন্টশিল্পকে টার্গেট করেছেন তারা। মজুরি বাড়ানোর শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এমনকি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন মেট্রোরেল, কেপিআইভুক্ত এলাকায় অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক ছড়ানো এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন নেপথ্যে থাকা এসব ব্যক্তি। যুগান্তরের অনুসন্ধান, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, গার্মেন্ট মালিক ও সাধারণ শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিল্প এলাকার মেট্রোরেল, ব্যাংক ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলা হতে পারে। এমনকি গুজব ছড়িয়ে সহিংস ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এ অবস্থায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, নিরাপত্তা জোরদার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে।

জানা গেছে, ১ নভেম্বর মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নামে আইডিয়াস ফ্যাশন, ভিশন, জকি ফ্যাশন, মিড এশিয়া গার্মেন্ট, লোডস্টার ফ্যাশন ও এর আশপাশের গার্মেন্টের ১০ হাজার শ্রমিক। অবরোধ তুলে নিতে পুলিশ আহ্বান জানালেও শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান করায় একপর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়। মল্লিক টাওয়ারের জানালার কাচ ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেন শ্রমিকরা। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মাদারল্যান্ড গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি সালেহা ইসলাম শান্তনা ও সাধারণ সম্পাদক আল আমিন ইসলাম। গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে স্টারলিং অ্যাপারেলস, এপেক্স ফুটওয়্যার, ট্রপিক্যাল নেটেক্স, অ্যাসেন্সিয়াল ক্লোদিং, শিশির নিটিং অ্যান্ড ডায়িং, লাকি স্টার অ্যাপারেল, এইচবিএস অ্যাপারেল, স্টাফ লিমিটেডের কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। শ্রমিকদের হামলায় ২২ পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশ বক্সে আগুন এবং এটিএম বুথে ভাঙচুর চালানো হয়। এই নাশকতার পেছনে কলকাঠি নাড়েন স্থানীয় যুবলীগ নেতা খাত্তাম মোল্লা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সেলিম। শ্রমিকদের উসকে দেন বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম মাজহার, বাহার উদ্দিন, আক্কাস, শাহ আলম, মনির, শাহনাজ, সুমি, মাসুদ, আসাদ, ফিরোজ, রোজিনা, আল আমিন, ডলি আক্তার, একতা গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের শ্রমিক নেত্রী সীমা আক্তার, গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের শ্রমিক নেতা জহির উদ্দিন, বাংলাদেশ শ্রমিক গার্মেন্ট টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের শ্রমিক নেতা রাশেদুল।

আশুলিয়ায় অনন্ত গার্মেন্ট, উইন্ডো গ্রুপ. আয়শা ক্লোথিং, শারমিন গ্রুপ, নিউএজ গার্মেন্ট, আল মুসলিম গ্রুপ, এভারস্টার সোয়েটার, বিডি স্কাইলাইন. এনার্জিপ্যাক ফ্যাক্টরি, লুসাকা গ্রুপ, অ্যাক্টিভ গ্রুপের শ্রমিকরা নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে নামধারী শ্রমিক নেতাদের উসকানিতে গার্মেন্টে ভাঙচুর করেন শ্রমিকরা। গার্মেন্টে ভাঙচুরে উসকানি দেন স্বাধীন বাংলা গার্মেন্ট কর্মচারী ফেডারেশনের আঞ্চলিক সভাপতি আল কামরান, গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য লীগের সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি তুহিন চৌধুরী, গার্মেন্ট ঐক্য ফেডারেশনের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি খোরশেদ আলম, পোশাকশিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসমাইল হোসেন ঠাণ্ডু।

সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অংশ নেন। মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পকারখানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মেট্রোরেল স্টেশন, ব্যাংক ও অন্যান্য স্থাপনা নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে।

সোমবার সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গার্মেন্ট মালিকদের সম্পৃক্ততার কথা জানান। তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকরা যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারাও অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছেন। সাবেক সংসদ-সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীও এর সঙ্গে জড়িত আছেন।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন ফেসবুক পোস্টে বলেন, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না। সহিংসতা, ভাঙচুর ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

৬৭৯ কারখানা বন্ধ : শ্রমিক অসন্তোষের কারণে থমকে গেছে গার্মেন্টের উৎপাদন কার্যক্রম। সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকার মোট ৬৭৯টি কারখানা শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বন্ধ রয়েছে।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার, আশুলিয়া, জিরানি বাজার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৫৫টি কারখানা খোলা ছিল। ৬৭৯টি কারখানার শ্রমিকরা কাজে অংশ না নিয়ে চলে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। মিরপুরের ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৫৫টি কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে গেছেন। কাজ না করে চলে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ৫৩ হাজার ৮৪০ জন। গাজীপুর এবং ময়মনসিংহ এলাকার ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টি কারখানা বন্ধ ছিল। সাভার-আশুলিয়া এবং জিরানী শিল্পাঞ্চলে ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টি কারখানার ৭ লাখ ৪৩ হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ রাখেন। নারায়াণগঞ্জে ১৯৯টি কারখানার মধ্যে ৯টি কারখানা থেকে শ্রমিক বের হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম এলাকায় ৩৪০টি কারখানা থাকলেও সেখানে কোনো শ্রমিক অসন্তোষ বা কাজ বন্ধের ঘটনা ঘটেনি। শিল্পাঞ্চলগুলোতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।

শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা : বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার যুগান্তরকে বলেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করবেন। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পতিত সরকারকে ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে শোনা গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের কর্মীদের শ্রমঘন শিল্প এলাকায় নানামুখী প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। তিনি আরও বলেন, কারখানা ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। সাধারণ কোনো শ্রমিক এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন না। শ্রমিকদের এই ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এজন্য মালিক-শ্রমিক সবাইকে সতর্ক থাকবে হবে।

তাসলিমা আখতার বলেন, মালিকদের উচিত দ্রততম সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণ করা। এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করলে গণ-অভ্যুত্থানবিরোধীরা সুযোগ নেবে।

সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, এই আন্দোলনকে ‘সুস্থ’ বলা যায় না। সাধারণ শ্রমিকরা আছেন মহাবিপদে। কাজে যোগ দিলেও কারখানায় ঢিল ছোড়ে, পথরোধ করে আন্দোলনে নিয়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ যেতে না চাইলে তার ওপর চড়াও হয়। তিনি আরও বলেন, মজুরি বৃদ্ধিতে গঠনমূলকভাবে আন্দোলন করলে কেউ বাধা দেন না, দেবেনও না। দিনশেষে শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় শ্রমিকদের বহন করতে হবে। বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পর আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই। মূলত একটি গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছেন। তারা দেশের অর্থনীতি পঙ্গু করতে পোশাকশিল্পকে বেছে নিয়েছেন। কারণ পোশাকশিল্প অর্থনীতির মেরুদণ্ড। খুব সহজেই এই শিল্পের সহজ-সরল শ্রমিকদের মোটিভেট করা যায়। তিনি আরও বলেন, শিল্পমালিকরা সব সময় শ্রমিকদের অবদানকে সম্মান জানান। শিল্পের সঙ্গে জড়িত কোনো সাধারণ শ্রমিক কারখানা ভাঙচুরে অংশ নিতে পারেন না। এর পেছনে অপশক্তির ইন্ধন আছে। এদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে না পারলে শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

পোশাক খাত নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন অস্থিরতার নেপথ্যে আ.লীগ

অস্থিরতার নেপথ্যে আ.লীগ

আন্দোলনের নামে অরাজকতা

আন্দোলনের নামে অরাজকতা

মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক আন্দোলনে ফ্যাসিস্টদের ইন্ধন রয়েছে

আন্দোলনে ফ্যাসিস্টদের ইন্ধন রয়েছে

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা দাবি শ্রমিক অসন্তোষে ৬৭৯ পোশাক কারখানা বন্ধ

শ্রমিক অসন্তোষে ৬৭৯ পোশাক কারখানা বন্ধ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম