আন্দোলনের নামে অরাজকতা
সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর রণক্ষেত্র; নারায়ণগঞ্জ-মিরপুরে বিক্ষোভ, পালটাপালটি ধাওয়া * পুলিশের গাড়িতে অগুন; সংঘর্ষে বিজিবি-পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত ১২ * বিশৃঙ্খলাকারীরা সাধারণ শ্রমিক নয়-ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার আশুলিয়ায় নরসিংহপুরে নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে সোমবার দুর্বৃত্তদের আগুনে পুড়ছে পোশাক কারখানার কাভার্ডভ্যান -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনে সোমবারও উত্তাল হয়ে ওঠে দেশের প্রধান পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলো। গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানীর মিরপুরেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকরা এ সময় বেশ কয়েকটি গাড়ি, কাভার্ডভ্যান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এতে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গাজীপুরে পুলিশের তিনটি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন শ্রমিকরা। এ সময় সংঘর্ষে বিজিবি-পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন ১২ জন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে রূপ নেয় সাভার ও আশুলিয়া। পরিস্থিতি সামলাতে আশুলিয়ায় গতকাল ২৬৪টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ও বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। ফতুল্লায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড চার ঘণ্টা অবরোধ করেন শ্রমিকরা। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈরে শ্রমিকরা অবস্থান নিলে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এসময় শ্রমিকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে বিজিবি সদস্য ও সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। কালিয়াকৈরে বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের সতর্ক করে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন-ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের পরও তাদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে আন্দোলনের নামে এমন নাশকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলাকারীরা কেউ সাধারণ শ্রমিক নয়। তাই নাশকতাকারীদের কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। যুগান্তর প্রতিবেদন, স্টাফ রিপোর্টার ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সাভার ও আশুলিয়া : বিক্ষোভে ফের উত্তপ্ত সাভার ও আশুলিয়ায় সোমবার শতাধিক পোশাক কারখানার শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন। সকালে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পালটাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর এবং সাভারের হেমায়েতপুরে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। এতে দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হন। শিল্প পুলিশের কয়েকজন সদস্যও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় একটি পোশাক কারখানার কাভার্ডভ্যানে আগুন দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। গতকাল দুই শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত কয়েকদিনের আন্দোলনে সাভার ও আশুলিয়ায় ২৩০টি গার্মেন্ট কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে।
চলমান এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাভারের সংসদ-সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। শ্রমিকদের অবরোধে মহাসড়কে তীব্র যানজট পরিদর্শনে এসে তিনি আরিচায় অবস্থান নিয়ে বলেন, পতিত সরকারের দোসররা সাভার ও আশুলিয়ায় গার্মেন্টসে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে আন্দোলন করার চেষ্টা করছে।
দুপুরের পর হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নেন। তারা শিল্পাঞ্চলে ভাঙচুর ও অস্থিরতার প্রতিবাদ জানিয়ে মহাসড়কে সমাবেশ করেন। এ সময় ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতরা পালিয়ে যায়।
আশুলিয়ার শারমিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, সকালে শ্রমিকরা কারখানায় এসে কাজে যোগ দেন। কিছুক্ষণ পর আশপাশের কারখানার শ্রমিকরা ছুটি ঘোষণার দাবিতে শারমিন গ্রুপের সামনে অবস্থান নেন। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করতে হয়। তিনি বলেন, শ্রমিকরা মহাসড়কে নেমে বিভিন্ন কারখানার দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
এর আগে একেএইচ গ্রুপের বড় একটি তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আগুনে কারখানার নিরাপত্তা বিভাগ পুড়ে গেছে। আমদানি-রপ্তানির কাজে ব্যবহৃত কাভার্ডভ্যান, শ্রমিকবাহী বাস এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়েছে। সকাল ১০টার পর আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর সাভারজুড়ে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এসে যানচলাচলে অবরোধ সৃষ্টি করেন। শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে দফায় দফায় লাঠি চার্জ এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আশুলিয়ায় সকালে শ্রমিকরা প্রথমে অনন্ত গ্রুপের কারখানা এবং পরে হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে জড়ো হন। বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তা ধাওয়া-পালটাধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পালটাধাওয়া চলে। সংঘর্ষের মধ্যে দুপুর ১২টায় নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি পোশাক কারখানার কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নরসিংহপুরের নিউএজ কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি শেষে কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
বিকালে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলাকারীরা কেউ সাধারণ শ্রমিক নয়। তাই নাশকতাকারীদের কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। বিকালে সাভারের বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের সুযোগে কিছু দুষ্কৃতকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। আমরা তাদের খোঁজখবর নিচ্ছি, তথ্য সংগ্রহ করছি। আন্দোলনের নামে বহিরাগত বিশৃঙ্খলাকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ সময় শ্রমিকদেরও সজাগ হওয়ার আহ্বান জানান ডিআইজি। আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় ১০ জনকে আশুলিয়া-বাইপাইল থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তারা শ্রমিক না বহিরাগত তা এখনো যাচাই-বাছাই করা হয়নি।
গাজীপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, বিজিবি-পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত ১২ : মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সোমবার সকাল থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা, নাওজোড় ও ভোগড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা। এ সময় মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, যানবাহন ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বিজিবি, পুলিশ ও সংবাদকর্মীসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গাজীপুরের দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সোমবার থেকে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
এদিকে, সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একদল শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নিলে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। বেলা ১১টার দিকে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে গেলে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন। অন্যদিকে দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোড় এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সময় টেলিভিশনের একজন প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালানো হয়। তাদের ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয়। এর আগেও কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে শিল্প পুলিশ, গাজীপুর জেলা পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। দুপুর ১টার পর শ্রমিকরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে যানচলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। গাজীপুর-১ আসনের সংসদ-সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, এটাকে তারা শ্রমিকদের বিক্ষোভ বলে মনে করছেন না। এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
কালিয়াকৈরে আ.লীগের ১৩ নেতাকর্মী গ্রেফতার : গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অরাজকতা, উসকানি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত তিন দিনে তাদের গ্রেফতার করা হয়। আন্দোলনের নামে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে ভাঙচুর, লুটপাট, হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গেল এক সপ্তাহের আন্দোলনের ভিডিও ফুটেজ শনাক্ত করে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এদিকে শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভকালে তাদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে বিজিবি সদস্য ও সাংবাদিকসহ ১০ জন আহত হয়েছেন।
কোনাবাড়ীতে বিএনপি নেতার মাথা ফাটাল আন্দোলনকারীরা : গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ীতে আন্দোলনরত শ্রমিকরা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ওপর হামলা করে ২ নেতার মাথা ফাটিয়েছে। এছাড়া বিএনপি নেতা বুলবুল আহমেদসহ অন্তত ৩ জন আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কোনাবাড়ী মেট্রো থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রবিউল আলম রবি এবং কোনাবাড়ী থানা শ্রমিক দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাহাবউদ্দিন হিমু মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ঢাকা-না.গঞ্জ লিংরোডে সড়ক অবরোধ : ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংরোডের শিবু মার্কেট ও ভুইঘর এলাকায় সোমবার অবরোধ করেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহবান জানান। পরে শ্রমিকরা রাস্তা ছেড়ে দিলে বিকাল ৪টা থেকে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। এর আগে সকালে শহরের সস্তপুর এলাকার মট্রো গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ গার্মেন্টস বন্ধ করে দেয়। পরে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামেন। এরপর অন্যান্য গার্মেন্ট শ্রমিকরা তাদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসেন। দুপুর ১২টা থেকে শিবু মার্কেট, কাঠেরপুল, কায়েমপুর, দেলপাড়া, পাগলা, ভুইঘর, রামারবাগ, কোতালেরবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত গার্মেন্টস শ্রমিকরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শিবু মার্কেট এলাকায় এসে জড়ো হন। পরে তারা একযোগে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের দুপাশে অবস্থান নেন। শিবু মার্কেট ওভারপাসসহ দুপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেন। এ সময় রাস্তার দুপাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। যাত্রীদের দীর্ঘ রাস্তা পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। সড়কে পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামানের গাড়িও প্রস্তুত রাখা হয়।
কালিয়াকৈরে বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের সতর্ক করে গণবিজ্ঞপ্তি : শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে কালিয়াকৈরে বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের সতর্ক করে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে পৌরকর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বহিরাগতদের প্রবেশ ও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের সতর্ক করেছে উপজেলা প্রশাসন। ভাড়াটিয়ার বাসায় বহিরাগত ব্যক্তি বা অপরাধী চক্রের সদস্যদের অবস্থানের তথ্য পেলে দ্রুত পুলিশ কিংবা প্রশাসনকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিককে দায়ভার নিতে হবে বলেও গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবার বিকালে কালিয়াকৈর পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ারা পরিবারের সদস্য নন, এমন কাউকে আশ্রয় দিলে কিংবা কোনো বহিরাগত অপরাধী চক্রের সদস্য বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করলে বিষয়টি দ্রুত কালিয়াকৈর থানা অথবা উপজেলা প্রশাসনকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে নির্দেশনাটিকে ‘অতি জরুরি’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিরপুরে পুলিশের বাধায় পিছু হটে শ্রমিকরা : বেতন বৃদ্ধির দাবিতে সোমবারও রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে খণ্ড খণ্ড মিছিল ও বিচ্ছিন্নভাবে প্রধান সড়কে নামার চেষ্টা চালান শ্রমিকরা। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। নিক্ষেপ করে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড। পুলিশের এমন কঠোর অবস্থানে পিছু হটে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকরা।
এদিকে আন্দোলনের নামে পুলিশের ওপর আক্রমণ, সংঘর্ষ, ধাওয়া-পালটাধাওয়া, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় মিরপুর এবং পল্লবী থানায় চারটি পৃথক মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাত সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পুলিশ বলছে-শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি ও নাশকতার পরিকল্পনা করছে।
শ্রমিকদের আন্দোলন দমাতে সোমবার সকাল থেকে মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে দাঙ্গা দমনের যান, জলকামানসহ বিভিন্ন যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়। বেলা পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার গলি দিয়ে শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেয় পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পোশাকশ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। এর কিছু সময় পর ফের একত্রিত হয়ে মিরপুর-২ নম্বরে স্টেডিয়ামের পাশের প্রশিকা মোড় এলাকার সড়কে নামার চেষ্টা করেন তারা। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে পুলিশের কঠোর অবস্থানে শ্রমিকরা পিছুহটে। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন-উত্তর) মহিদুল ইসলাম বলেন, মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে কি না-তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সংঘর্ষ-আগুনের ঘটনায় ৪ মামলা, আসামি সাড়ে ১০ হাজার : মিরপুরে টানা দুদিনের শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মিরপুর এবং পল্লবী থানায় চারটি পৃথক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাত সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলায় এখন পর্যন্ত অর্ধশত মানুষকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ২২ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।
