দেশের সার্বিক অর্থনীতির হালচাল
কর্মসংস্থান বিনিয়োগে মন্দা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে টানা সাড়ে তিন বছর চলছে মন্দা। গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপেও তা এখনো কাটেনি। বেসরকারি খাতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি, এখনো বিরাজ করছে অস্থিরতা। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ। নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না, বরং আগের চেয়ে কমেছে।
চলতি বছরে অর্থনীতিকে তিন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এগুলো হচ্ছে-উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক চাপ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লুটপাটের লুকানো তথ্য বেরিয়ে আসায় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী আর্থিক খাত ঋণের জোগান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এদিকে, বৈশ্বিক খাতে গত এক বছরে সরকারের নেওয়া নানামুখী পদক্ষেপের ফলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ডলারের প্রবাহ বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অব্যাহত পতন রোধ করা গেছে। এতে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে রিজার্ভ। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করে এ খাতে ঝুঁকি কমানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, গত এক বছরে আর্থিক খাতে সরকারের নেওয়া নানামুখী সংস্কার কার্যক্রম চলমান। এর সুফল এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে চলতি অর্থবছর থেকে তা সামনে আসতে পারে। গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির হারকে নিম্নমুখী করা, দেশ থেকে টাকা পাচার রোধ, নতুন করে ব্যাংক দখল ও লুট বন্ধ, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা আনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ঊর্ধ্বমুখী করা, বৈদেশিক ঋণের চাপ কমানোর প্রভাব এ বছর দৃশ্যমান হতে পারে।
জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বেকারত্ব কমানো এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর পদক্ষেপগুলো এখনো দৃশ্যমান নয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়েনি, শিল্প খাতে মন্দা এখনো প্রকট। তবে গড়ে শিল্প উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছে। ঋণপ্রবাহ যথেষ্ট কম। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়েনি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি বাড়ানোর সঙ্গে এগুলো সম্পর্কিত। সরকার আশা করছে, চলতি অর্থবছরে এসব খাতে গতি বাড়বে।
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দলটি টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। ওই সময় রাষ্ট্রীয় প্রভাবে ব্যাংক দখল ও লুটপাট করা হয়েছে। লুটের টাকা পাচার হয়েছে বিদেশে। এর মধ্যে করোনা ও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে ফোকলা অর্থনীতির বিষফোড়াগুলো বেরিয়ে আসতে থাকে।
সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ব্যয়নির্বাহ করতে থাকে। এতে মূল্যস্ফীতির পারদ ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ওই বছরের আগস্টে তা সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর তা বাড়তে থাকে। আড়াই বছর এ হার টানা বেড়ে গত বছরের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে।
গত বছরের ৮ আগস্ট বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে মূল্যস্ফীতির হার কমানো, ডলারের বাজার স্থিতিশীল করাসহ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার নানামুখী পদক্ষেপ নেয়। প্রথম চার মাস এর কোনো সুফল আসেনি। পরবর্তী সময়ে সুফল আসতে শুরু করে। পণ্যমূল্য হ্রাসে মূল্যস্ফীতির হার কমতে থাকে। গত জুনে এ হার কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে নেমে আসবে। পাশাপাশি জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারও বেড়ে সাড়ে ৫ শতাংশ হতে পারে। যেটি এখন ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে রয়েছে।
দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতিকে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে পারলে তা হবে স্বাভাবিক। কিন্তু চলতি অর্থবছরের মধ্যে এ হার সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে নামলেও মূল্যস্ফীতির হার চড়া বা অস্বাভাবিক থাকছে। চলতি অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি নামক একধরনের কর ভোক্তাকে দিতে হবে।
বৈশ্বিক চাপ কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে পালটা শুল্ক আরোপ করায় এ চাপ আবার বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন পর্যন্ত মার্কিন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ পালটা শুল্ক দেওয়ার কথা রয়েছে। এ হার হয়তো কিছুটা কমবে। তারপরও বাড়তি শুল্ক দিতেই হবে। বর্তমানে দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ। এ হার আরও বাড়লে দেশের পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যার নেতিবাচক প্রভাব কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে ডলারের বাজারেও পড়বে। এ চাপ মোকাবিলা করতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে।
আর্থিক খাতের দুর্বলতা এখন অর্থনীতির জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত সরকারের লুটপাটের চিত্র দৃশ্যমান হওয়ায় সেগুলো খেলাপি হচ্ছে। এতে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে। এটি অচিরেই ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যত স্বাভাবিক হচ্ছে, তত বেশি ঋণের চাহিদা বাড়বে। চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দেওয়া বর্তমানে আর্থিক খাতের নেই। ফলে অর্থায়ন জটিলতায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি সীমার মধ্যে থমকে থাকবে বলে সম্প্রতি আইএমএফ এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে।
আইএমএফ অপর এক প্রতিবেদনে বলেছে, ডলারের প্রবাহ এখন বেশি হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়লে আমদানিও বাড়বে। তখন ডলারের ওপরও চাপ বাড়বে।
অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হচ্ছে রাজস্ব আয়। নানা জটিলতায় বিদায়ি অর্থবছরে রাজস্ব আয় কম হয়েছে। এ কারণে সরকারকে কৃচ্ছ সাধন করেও চলতি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয় বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি না বাড়ানো গেলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনই কর্মসংস্থানের গতিও প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না।
বর্তমান সরকারের এক বছরে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে লক্ষ্যগুলো অর্জিত না হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি প্রধান ক্ষেত্র-কৃষি, শিল্প ও পরিষেবার কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বাধার সম্মুখীন হয়। যখন নতুন সরকার অর্থনৈতিক সংস্কারের বৃহত্তর প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে, তখন ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অনেক জেলায় বেশ কয়েকবার বন্যার কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এছাড়াও সরকার আর্থিক সংকটের কারণে কর্যক্রম চালাতে পারছিল না। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ফোকলা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সহজ কোনো পথ ছিল না। আওয়ামী সরকার পতনের আগে অর্থনৈতিক মূল শক্তিগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পতনের সঙ্গে সঙ্গে ওইসব শক্তি উধাও হয়ে যায়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা আরও প্রকট হয়।
বিশ্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি আরও বাড়ার প্রাথমিক যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, তাতে ছেদ পড়ে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর বিস্তৃত শুল্ক আরোপের পর। নতুন মার্কিন বাণিজ্য নীতি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশে অনিশ্চয়তা আবার ফিরিয়ে এনেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বিদায়ি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছিল ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) বেড়েছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাবে ঋণপ্রবাহও বাড়বে। তবে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনো কাটেনি। এর নেতিবাচক প্রভাব এখনো বেসরকারি খাতে বিদ্যমান।
শিল্পোৎপাদনে খরা কাটতে শুরু করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে শিল্পোৎপাদন বেড়েছিল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
বিগত সরকারের সময়ে ডলারের দাম যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছিল, সেটি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এখন ডলারের দাম নিম্নমুখী করা সম্ভব। কিন্তু অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় তা করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ডলারের দাম স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ার কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ফলে এ খাতে চাপ কমেছে।
