চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় বাড়ছে শীত
জানুয়ারিতে আসছে শৈত্যপ্রবাহ
Advertisement
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্ব হয়ে উঠেছে চরমভাবাপন্ন। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর তীব্র শীতের অনুভূতি পাওয়া যাচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের আগেই। আর তাপমাত্রার তুলনায় শীতের অনুভূতিও প্রকট। জনজীবন ইতোমধ্যেই শীতে অসাড় হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানে কোনো এলাকায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর নিচে তাপমাত্রা শৈত্যপ্রবাহ হিসাবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই তাপমাত্রা দেশের খুব কম জেলায় রেকর্ড করা হলেও এবার ঠান্ডা ও শীতের অনুভূতি তীব্র। অন্য বছর শীতকালে সাধারণত দিনে তাপমাত্রা বেশি থাকে, রাতে অনেকটা কমে যায়। চলতি শীত মৌসুমে চিত্র ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন জেলায় দিনের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে; আর রাতে তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে কম।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এটিও হচ্ছে জলবায়ু পরির্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও আবহাওয়াবিদ মো. মমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে একটি কুয়াশাবলয় অবস্থান করছে। সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারছে না। যার কারণে দেশে কয়েকদিন ধরে শীতের অনুভূতি তীব্র। তাপমাত্রা সেভাবে কমেনি। শৈত্যপ্রবাহ বলার মতো অবস্থা নেই। তারপরও ঠান্ডার অনুভূতি বেশ। এ অবস্থা আরও কয়েকদিন থাকতে পারে। ১ জানুয়ারি থেকে পরিবর্তন হতে পারে।
মমিনুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আমরা লক্ষ করছি। যখনই কোনো কিছু ঘটে, তখন সেটি ‘এক্সট্রিম’ মাত্রায় পৌঁছে যায়। কম সময়ে অনেক বৃষ্টিপাত হতে দেখা গেছে এ বছর। শীতের এই তীব্রতা জলবায়ু পরিবর্তনেরই এক ধরনের প্রভাব। এ বছর যতটা তীব্র শীত পড়ছে, ততটা গত কয়েক বছর দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, জানুয়ারিতে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। শৈত্যপ্রবাহ আসতে পারে। তবে বর্তমানে তাপমাত্রা অনুযায়ী শীতের অনুভূতি এমনটা হওয়ার কথা নয়। এটি হচ্ছে সূর্যের আলো না পাওয়ার কারণে।
তাপমাত্রার এক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একদিনের ব্যবধানে ৩১ ডিসেম্বর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি কমে হয় ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে এ বছরের ১ জানুয়ারি ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটি ২ জানুয়ারি ৪ ডিগ্রি কমে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। ৩ জানুয়ারি তাপমাত্রা ছিল ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মূলত এই পাঁচ দিন দিনে বেশি ঠান্ডা অনুভূত হয় গত শীত মৌসুমে।
এদিকে চলতি শীত মৌসুমে ২৩ ডিসেম্বর ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটি সোমবার ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা কমেছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যেটি অনেকটা অনাকাক্সিক্ষত। আবহাওয়াবিদরা আরও বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন, রাতের পরিবর্তে দিনে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, সোমবার ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা গত কয়েক বছরের মধ্যে রাজধানীর সর্বনিম্ন।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ যুগান্তরকে বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এই মৌসুমে তীব্র শীত পড়তে শুরু করেছে কিছুটা আগে। ২৩ ডিসেম্বর থেকেই সেটি লক্ষ করা যাচ্ছে। তীব্র শীত গত মৌসুমে শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর। গত কয়েকদিনে তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি কমে যাওয়াটা একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় আবহাওয়ায়। আরও উল্লেখযোগ্য, তাপমাত্রা দিনে বেশি কমছে। যেটি আগে সাধারণত রাতে বেশি মাত্রায় কমতে দেখা যেত। রাতে তাপমাত্রা এখন কমছে ২ থেকে আড়াই ডিগ্রি। পুরো বিষয়টি অন্যান্য বছরের উলটো দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমলে মানুষের শরীর সেটি ধীরে ধীরে সামঞ্জস্য করে নেয়। কিন্তু হঠাৎ তাপমাত্রা অনেক কমে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি হঠাৎই সবার কাছে অনেক বেশি।
আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, শীতের অনুভূতি নির্ভর করে দিনের তাপমাত্রার ওপর। যদি দিনের তাপমাত্রা কম থাকে, তাহলে শীতের অনুভূতি বেশি। সেক্ষেত্রে রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকলেও শীতের অনুভূতি বেশি হতে দেখা যায়। কয়েকদিন ধরে দেশের নানা জায়গায় তাপমাত্রা ১০-এর ওপরেই আছে। তারপরও শীতের অনুভূতি বেশি। কারণ, দিনের তাপমাত্রা কম। দিনের তাপমাত্রা যদি বেশি থাকে এবং রাতের তাপমাত্রা যদি ৭-৮ ডিগ্রিতেও নেমে আসে, তখনও সেটা শৈত্যপ্রবাহ। কিন্তু তখন শীতের অনুভূতি কম হবে। কারণ দিনে তাপমাত্রা বেশি ছিল।
ব্যাহত জীবনযাত্রা : তীব্র শীতে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা-ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল, থমকে যাচ্ছে স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষ এবং শিশু ও বয়স্করা। সোমবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর রাজধানীর তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৮। ব্যুরো ও প্রতিনিধির পাঠানো খবর-
যশোর : টানা দুই দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পর রোববার তাপমাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও সারা দিন যশোরে সূর্যের দেখা মেলেনি। সোমবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন ভোর থেকেই জেলার আকাশ ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘে ঢাকা। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ ও শ্রমজীবীরা।
বরিশাল : ঘন কুয়াশার কারণে নৌ ও সড়ক পথে বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত পাঁচ দিনে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। কুয়াশার কারণে রোববার থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বরিশাল নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ।
ঠাকুরগাঁও : চার দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। দিনভর ঘন কুয়াশার দাপট আর উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ায় বিপর্যস্ত জেলার জনজীবন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছে না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে খড়কুটা জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যায় মানুষকে। কনকনে ঠাণ্ডায় গরু-ছাগল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারি ও কৃষকরা।

