সাবেক ডিবিপ্রধান হারুনের অপকর্ম
অবৈধ সম্পদের রক্ষক ছোট ভাই শাহরিয়ার
শ্রীমঙ্গলের প্যারাগন রিসোর্টের মূল্য দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা! * শাহরিয়ারের সঙ্গে এর মালিকানায় আছেন রাকিব উদ্দিন ও রোকন উদ্দিন
Advertisement
সাদ্দাম হোসেন ইমরান
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গুম-খুন, অপহরণের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েন আলোচিত-সমালোচিত সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশিদ। আপন ছোট ভাইকে বানান সেই সম্পদের রক্ষক। কর ফাঁকি দিতে চিকিৎসক ভাইকে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট’ ও শ্রীমঙ্গলের রাধানগরে ‘প্যারাগন রিসোর্ট’-এর মালিক বানান। যার পুরোটাই অবৈধ অর্থে গড়া। এ নিয়ে তদন্ত করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট।
সম্প্রতি প্যারাগন রিসোর্টের একটি অডিট রিপোর্ট যুগান্তরের হাতে এসেছে। যা বিশ্লেষণ করে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার দশা। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের রাধানগরে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন এই রিসোর্টটি তিন তারকা মানের। সুইমিং পুল, জিম, স্পা, হট টাব, প্লে জোন, ইনডোর গেমস, কনফারেন্স রুমসহ রিসোর্টের সর্বত্রই রয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। এর ৩৫০ স্কয়ার ফিটের একটি রুমের ভাড়া ১৬-২০ হাজার টাকা। তবে কালো টাকায় গড়ে তোলা এ রিসোর্টের দাম এতটাই কমিয়ে দেখানো হয়েছে-যা শুনলে যে কোনো মানুষ মুঘল আমলে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বলছে, এ রিসোর্টের মূল্য ১১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় স্থপতিরা মনে করেন, এতে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। প্যারাগন হোটেলের আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুখ্যাত পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের (ডিবি হারুন) ছোট ভাই ডা. এবিএম শাহরিয়ারও আছেন এর মালিকানায়। যদিও আগের অর্থবছরে তার নামে থাকা এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার শেয়ার পরের বছরের হিসাবে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কোম্পানির দুই শেয়ারহোল্ডারের শেয়ার বেড়েছে ও নতুন করে দুই কোটি টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। এসব অর্থের উৎস, শেয়ার মালিকানা পরিবর্তন ও অবকাঠামো নির্মাণের অর্থায়ন নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন আয়কর কর্মকর্তারা।
এছাড়াও রিসোর্টের মালিকানায় আছে রাকিব উদ্দিন দেওয়ান (রতন) ও রোকন উদ্দিন দেওয়ান (স্বপন)। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুই ভাই ডিবি হারুনের অপকর্মের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ক্যাশিয়ার ছিলেন। হারুন গাজীপুরে পুলিশ সুপার পদে থাকাকালীন এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা তারা করেননি। এক সময় সাধারণ ব্যবসা করা রতন ও স্বপন ডিবি হারুনের স্ত্রী শিরীন আক্তারকে ধর্মের বোন বানান। এরপর ঘুরে যায়, তাদের ভাগ্যের চাকা। ডিবি হারুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বদৌলতে রতন ও স্বপন বিভিন্ন ব্যবসা, সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিকে পরিণত হন। গুম-খুন, অপহরণের মাধ্যমে হারুনের উপার্জিত অবৈধ অর্থ তারা ব্যবসায় খাটান। পরে সেই ব্যবসার অংশীদার করা হয় হারুনের ছোট ভাই শাহরিয়ারকে। প্যারাগন রিসোর্টের ২০২৫ সালের ৩০ জুন অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বলছে, কোম্পানির মোট সম্পদ ১১ কোটি ৫৭ লাখ আট হাজার টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সম্পদ বেড়েছে প্রায় তিন কোটি ৪০ লাখ টাকা। স্থায়ী সম্পদ খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেখানো হয়েছিল সাত কোটি ২৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট দেশের কয়েকজন শীর্ষ স্থপতির সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে, এই স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে অন্তত ২০০ কোটি টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়কর গোয়েন্দার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণব্যয়ের সঙ্গে নিরীক্ষিত হিসাবে দেখানো সম্পদের মূল্যের বড় ব্যবধান রয়েছে। নির্মাণ ব্যয়, জমির মূল্য, অবচয় ও সম্পদের হিসাব কোন ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে-এ বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির জমি ও ভবন কেনার দলিল, নির্মাণকাজের চুক্তি, ঠিকাদারদের বিল, ব্যাংক লেনদেন, ঋণের তথ্য ও সম্পদ মূল্যায়নের প্রতিবেদন পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। নির্মাণব্যয়ের কোনো অংশ অন্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির হিসাবে দেখানো হয়েছে কিনা, তাও যাচাই করা হবে।
অডিট রিপোর্টের শেয়ারহোল্ডিং বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এবিএম শাহরিয়ারের নামে ছিল এক লাখ পাঁচ হাজার শেয়ার। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০০ টাকা হিসাবে এর মূল্য এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেয়ারহোল্ডিং তালিকায় তার নাম নেই। একই সময়ে মোহাম্মদ রাকিব উদ্দিন দেওয়ান ও মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন দেওয়ানের প্রত্যেকের শেয়ারসংখ্যা দুই লাখ ৪৫ হাজার থেকে বেড়ে দুই লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেকের শেয়ার বেড়েছে ৫২ হাজার ৫০০টি করে। অন্যদিকে কোম্পানিতে নতুন করে দুই কোটি টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ হোসাইন খানের ৩০ লাখ টাকা এবং রাকিব উদ্দিন দেওয়ান ও রোকন উদ্দিন দেওয়ানের প্রত্যেকের ৮৫ লাখ টাকা রয়েছে। আয়কর গোয়েন্দাদের ধারণা, শাহরিয়ারের শেয়ার হস্তান্তরের দলিল, শেয়ার বিক্রির মূল্য ও নতুন বিনিয়োগের অর্থের উৎস যাচাই করলে মালিকানা পরিবর্তনের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে। অডিট রিপোর্টে অবশ্য শেয়ারগুলো কার কাছে ও কী মূল্যে হন্তান্তর করা হয়েছে, তার বিস্তারিত নেই। হয়তো গায়ের জোরেই এই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিজের ভাইয়ের নামে করিয়েছিলেন ডিবি হারুন। পরে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মালিকানায়ও পরিবর্তন এসেছে।
সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ ও তার ছোট ভাই এবিএম শাহরিয়ারের সম্পদের উৎস নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। দুদক হারুন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পৃথক মামলায় অভিযোগপত্র অনুমোদন করেছে। দুদক হারুনের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ কোটি টাকা ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রায় ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে।
