শীতের তীব্রতায় হাসপাতালে বাড়ছে রোগী
ভর্তি শিশুদের ৬০% নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত
জাহিদ হাসান
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর শিশু হাসপাতালে ঠান্ডা শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুকে নেবুলাইজার দিচ্ছেন মা। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রকৃতিতে শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের মধ্যে শীতজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডাজনিত জ্বরের পাশাপাশি শিশুদের নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, কোল্ড ডায়রিয়া (রোটাভাইরাস) এবং বিভিন্ন ভাইরাসজনিত সংক্রমণ বেশি। চিকিৎসকরা বলছেন, শীতজনিত রোগে ভর্তি শিশুদের ৬০ ভাগই নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস সমস্যা নিয়ে আসছে।
তাদের মতে, তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠায় এসব জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো তীব্র আকার ধারণ করেনি। শীতজনিত রোগ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা। বিশেষ করে সর্দি-কাশি না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করার কথা বলেন তারা।
সোমবার। ঘড়ির কাঁটায় বেলা আড়াইটা। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপতালের সপ্তমতলার শিশু ওয়ার্ডের ‘বি’- ৪ নম্বর বিছানায় মায়ের কোলে শোয়া দুই মাস বয়সি শেখ আয়ানের নিউমোনিয়াজনিত সমস্যায় তীব্র শ্বাসকষ্টে বুক ওঠানামা করছিল। শিশুটির মা ফাহিমা আক্তার শয্যা পাশে থাকা নেবুলাইজার মেশিনের নলের অপরপ্রান্তে লাগানো প্লাস্টিকের মাস্ক ছোট্ট আয়ানের নাক ও মুখে চেপে গ্যাস (অক্সিজেন) দেওয়ার মাধ্যমে শ্বাসকষ্ট কমানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছিলেন। একই সঙ্গে অশ্রুসজল চোখে সন্তানের কষ্ট লাঘবের জন্য অনবরত আল্লাহর দরবারে দোয়া পড়ছিলেন।
উত্তরার মৈনারটেক এলাকার বাসিন্দা ফাহিমা আক্তার বলেন, ২৫ ডিসেম্বর হঠাৎ বাচ্চার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বুকের দুধও টেনে খেতে পারছিল না। শ্বাসকষ্টের সঙ্গে কাশি ও অনবরত কান্না করছিল। ওইদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় ক্লিনিকে নিলে চিকিৎসক নিউমোনিয়া হয়েছে জানিয়ে ৫টা ইনজেকশন লিখে দেন। তিন দিন তিনটি দেওয়ার পরও স্বাভাবিক হচ্ছিল না। আজ (সোমবার) সকালে উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে দ্রুত কুর্মিটোলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। এখানকার চিকিৎসকরা ভর্তি করে গ্যাস (অক্সিজেন) দিয়েছেন। হাতে ক্যানোলার মধ্যেমে দুটি ইনজেকশন দিয়েছেন। এখনো তেমন উন্নতি হয়নি।
একই সমস্যা (নিউমোনিয়া) নিয়ে ‘বি’-৫ নং বিছানায় ভর্তি রয়েছে তিন বছরের শিশু আয়ান ইব্রাহিম। শিশুটির মা ফারজানা আক্তার বলেন, হঠাৎ ছেলের হালকা জ্বরের সঙ্গে কাশি, সর্দি ও হাত-পা ব্যথা শুরু হয়। প্রথমে গুলশান মা ও শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে জ্বরের জন্য নাপা, ঠান্ডার চিকিৎসায় অ্যামব্রক্স সিরাপ, সর্দি বন্ধে নাকে আফরিন ড্রপ দেই। তারপরও পরিস্থিতি উন্নতি না হলে চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। পরে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করি। পরে ২৬ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টায় ছেলের শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ও ১০৫ ডিগ্রি জ্বর দেখা দেয়। রাত ২টায় হাসপাতালে এলে নাকে-মুখে অক্সিজেন দিয়ে ভর্তি নেয়। ২৪ ঘণ্টায় চারবার করে নেবুলাইজ করতে নাকে নল পড়িয়ে দিয়েছে। এ কয়দিনে তিন বার এক্সরে, ১৭ বার রক্ত পরীক্ষা, একবার আল্ট্রা-স্নো ও দুইবার ইউরিন টেস্ট করতে হয়েছে।
শিশু ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. ইশরাত জাহান যুগান্তরকে বলেন, শীতের শুরুতে ঠান্ডাজনতি রোগ বিশেষ করে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস আক্রান্ত শিশু বেশি আসছে। বর্তমানে ওয়ার্ডে ৬৯ জন শিশু ভর্তি আছে। রোগীদের ২০ শতাংশ (২৩ জন) শীতকালীন রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়া, ২০ শতাংশ হেপাটাইটিস, ডায়াবেটিস মেলিটাস, এবডোমিনাল পেইন, ইউটিআই, নেফ্রইটিস, অপুষ্টি, জন্ডিস, রেসপেরিটেরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন ও ডেঙ্গু রোগী। বাকি ৬০ শতাংশ নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস সমস্যায় ভুগছে।
ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স জান্নাতুল ফেরদৌস ও শিফা বলেন, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত শিশু ওয়ার্ডে ১৫ জন ভর্তি হয়েছে। জেনারেল বেড ছাড়াও রোগীর চাপে ১০ বেডের স্ক্যানু ইউনিটে ১৫ থেকে ১৮ জন করে শিশু ভর্তি থাকছে।
এদিকে রাজধানীর মুগদা হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরেও এমন চিত্র দেখা গেছে। এখানে শীতজনিত কারণে নতুন রোগীর চাপ বেড়েছে। রোগীদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধ এবং বক্ষব্যাধিজনিত রোগের উপস্থিতি বেশি।
হাসপাতালের চিকিৎসক বলেন, শীতকালে শিশুদের নিউমোনিয়া হয় মূলত ঠান্ডা বাতাস ও ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেওয়ায়। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া শ্বাসনালিতে সংক্রমণ ঘটায়, যা ফুসফুসের অ্যালভিওলিকে তরল বা পুঁজ দিয়ে পূর্ণ করে তোলে, যার ফলে কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা হয়; দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানো এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস শিশুদের নিউমোনিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়া এবং হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (হিব) প্রধান ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণ।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২৬১ জন শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। একই সময়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৫৭ জন। এ ছাড়া সাধারণ সর্দিকাশিতে ৮১৬ এবং নিউমোনিয়াজনিত হাঁপানিতে ১২১ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।
হাসপাতালটিতে শুধু ২৩ ডিসেম্বর একদিনেই বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে এক হাজার ২৩৪টি শিশু। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা পেয়েছে ২৬০ জন, মেডিসিন বিভাগে ৭৯২ এবং সার্জারি বিভাগে ১৮২ জন। ২৪ ঘণ্টায় সর্দিকাশিতে ২৫৩ জন, নিউমোনিয়ায় ৪৬, হাঁপানিতে ২৩, স্ক্যাবিসে ১৫৩, অন্যান্য চর্মরোগে ২২৩ এবং ডায়রিয়ায় ৫৪টি শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
শীতজনিত রোগে করণীয় বিষয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, মানুষ শীত মৌসুমে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা। তাই প্রয়োজন না হলে বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে যেতেই হলে অবশ্যই গরম কাপড় পরতে হবে। শিশুদের কুসুম গরম পানি পান করানো উচিত। একইভাবে গর্ভবতী নারীদের জন্য শীতকালীন সুরক্ষা আরও জরুরি। কারণ এই সময় তাদের শীতজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে। যাদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস বা শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগ রয়েছে, তাদের বাড়তি সতর্কতা জরুরি। নিজের ইচ্ছায় কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মেহনাজ বলেন, শীতের তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতিতে বিদ্যমান কিছু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে সর্দিকাশি, ঠান্ডাজনিত জ্বর ও নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিসের মতো রোগ দেখা দেয়। শিশুদের পেটের অসুখ ও ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার প্রবণতাও বেড়ে যায়। বর্তমানে এই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ১০০ শয্যার সবগুলো রোগীতে পূর্ণ রয়েছে। এসময় সবাইকে পর্যাপ্ত শীতের পোশাক ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। শীতের বিরুদ্ধে শরীরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
রাজধানীতে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতে বিপর্যস্ত কর্মজীবী মানুষ : শীতের দাপটে দেশের অনেক অঞ্চলে সূর্যের দেখাও মেলেনি। রাজধানীসহ দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে কনকনে শীত। আরও তিন-চার দিন দেশে এমন অবস্থা বিরাজ করতে পারে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বংশাল থানাধীন ফ্রেন্ডস রোডে সরেজমিন দেখা যায়, শীত নিবারণে রাস্তায় খড়কুটো, কাঠ ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত সামগ্রী জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও দোকানকর্মীরা। অনেকেই আগুন ঘিরে দাঁড়িয়ে শরীর গরম করার চেষ্টা করছেন। এ সময় পথচারী মো. আবুল বাশার বলেন, ‘শীতের শুরুতে তেমন প্রভাব ছিল না। গত ২৪ তারিখ থেকে হঠাৎ প্রচণ্ড শীত পড়েছে। আমাদের মতো কর্মজীবী মানুষের শীতের জামা-কাপড় পর্যাপ্ত না থাকায় কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। আয়-রোজগারেও প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিম্নআয়ের মানুষদের অনেকেই শীতবস্ত্রের অভাবে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে ভাসমান মানুষ, পথশিশু ও দিনমজুররা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক ও দিনমজুররা জানান, বেশি শীতের কারণে লোকজন ঘর থেকে কম বের হচ্ছে। নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ কম হচ্ছে। কিন্তু আয় কমলেও সংসারের ব্যয় কমছে না।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক ইব্রাহীম মুন্না বলেন, এ ধরনের তীব্র শীতে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। শীতজনিত রোগ থেকে বাঁচতে উষ্ণ পোশাক পরিধান, গরম খাবার গ্রহণ এবং আগুন পোহানোর সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
