সন্দ্বীপের মায়ায় পড়েছিলেন কবি নজরুল
কোথাও নেই স্মৃতিচিহ্ন, কবিপ্রেমীদের ক্ষোভ
Advertisement
এমএ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জীবদ্দশায় একবারই চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে গিয়েছিলেন। সাম্পান থেকে মাটিতে পা রেখেই সন্দ্বীপের প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হয়ে কবি বলেছিলেন, ‘চমৎকার জায়গা, এ যেন একটা মায়াপুরী।’ ভ্রমণের এই সময়ে কবি গাড়িতে চড়ে প্রায় ২০ মাইল পথ অতিক্রম করেছিলেন। গ্রামের পথ ছিল অসমতল। পথের এই দৃশ্য কবির কল্পনাকে স্পর্শ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘পথের উপর ঢেউ খেলে যায় গাড়ি কাহার দেশে’। গুবাকসারির ছায়াতলে বসে সেই সময় কবি তার ‘চক্রবাক’ কাব্যের অনেক কবিতা এবং ভাটিয়ালি সুরে বহু ‘সাম্পানের গান’ রচনা করেন।
সন্দ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তিনি রচনা করেছিলেন ‘মধুমালা’ গীতিনাট্য। মায়ায় পড়ে দ্বিতীয়বার যেতে চেয়েছিলেন সেই মায়াপুরীতে। কিন্তু তা আর হয়নি। অথচ কবি নজরুলের সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানের কোথাও একটি স্মৃতিচিহ্ন নেই। এ নিয়ে কবিপ্রেমীদের বিস্তর ক্ষোভ রয়েছে।
জানা যায়, ১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার চট্টগ্রামে আসেন কবি নজরুল। কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম শহরে প্রিয় শিষ্য হাবিবুল্লাহ বাহারের বাসায় উঠেছিলেন। এরপর ২৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে স্টিমারে সন্দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করেন কবি। শীতের সমুদ্র তখন শান্ত। স্টিমার এগিয়ে চলেছিল সন্দ্বীপের দিকে। তার সঙ্গে ছিলেন আবদুল মোক্তাদের, সলিম উল্যা চৌধুরী ও আবদুল ওয়াজেদ। জাহাজ ঘাটে ভিড়লে স্টিমার থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নামিয়ে তোলা হলো দেশীয় সাম্পানে। এ সময় কবি বলেছিলেন, ‘আমার মতো ভবঘুরে পর্যন্ত এখানে নীড় বাঁধতে চাইবে।’
শোভাযাত্রাসহকারে সন্দ্বীপ টাউনের ডাকবাংলোতে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন সন্দ্বীপ স্টিমার ঘাট থেকে ডাকবাংলোর দূরত্ব ছিল ৪-৫ মাইল। সন্দ্বীপে কবির যাতায়াতের জন্য একটি গাড়িরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ডাকবাংলোতে বসে সন্দ্বীপের সুমিষ্ট ডাবের পানি পান করতে করতে কবি হঠাৎ বলে উঠলেন-‘এ যেন একেবারে সরাবে তহুরা।’ ওই সময় কবিকে দেখার জন্য ডাকবাংলোতে বহুলোকের ভিড় জমে। নজরুল তাদের লক্ষ করে বলে উঠলেন, ‘আপনাদের দেখে খুব ভালো লাগছে। কী সুন্দর স্বাস্থ্য, কি কামনীয় চেহারা। আপনারা সবই বুঝি আরবি পড়তে ও সাঁতার কাটতে জানেন? বিলেতে কে কয়বার গিয়েছেন?’ কার্গিল হাইস্কুলের মাঠে নজরুলকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সংবর্ধনা সভার সভাপতি ছিলেন তখনকার সন্দ্বীপের খ্যাতনামা ব্যক্তি প্রসন্ন কুমার দাস (মোক্তার)। এ সভায় কবিকে অনেকগুলো মানপত্র দেওয়া হয়। যার একটি বর্তমানে নজরুল ইনস্টিটিউটে রয়েছে।
নজরুল গবেষক ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন তার বইয়ে উল্লেখ করেন, সন্দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হন চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সলিম উল্যা চৌধুরী এবং কমরেড মুজফ্ফর আহমদের ভাতিজা আবদুল মোক্তাদের। তাদের সঙ্গে ছিলেন মুজফ্ফর আহমদের আরেক ভাতিজা আবদুল ওয়াজেদ। অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতা মুজফ্ফর আহমদ ছিলেন সন্দ্বীপের মুছাপুর গ্রামের সন্তান। কলকাতার সাহিত্য ও রাজনৈতিক জগতে নজরুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই আবদুল মোক্তাদেরের সঙ্গে নজরুলের সখ্য তৈরি হয়েছিল।
সন্দ্বীপ ভ্রমণের সময় কবি যেখানেই গেছেন, সেখানেই কবিকে দেখার জন্য শত শত লোক জমা হতো। উপস্থিত জনতাকে গানে গানে মাতিয়েছেন কবি। বিভিন্ন লেখকের বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, কবি নজরুল প্রকাশ্যে সন্দ্বীপের রান্না-বাড়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। কবি কলকাতা ফিরে গিয়ে তার বন্ধুদের কাছে সন্দ্বীপের হরেক রকম পিঠা-পুলির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। শুধু তাই নয়, কবি সন্দ্বীপে পুনরায় আসারও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
কবি যখন সন্দ্বীপ গিয়েছিলেন, তখন ছিল মাঘ অর্থাৎ শীতকাল। ওই সময় সন্দ্বীপের ঘরে ঘরে শীতের পিঠা ও খেজুরের রসের শিরনি উৎসবের আমেজে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন কবি। সন্দ্বীপে কবির সবচেয়ে লোভনীয় খাবার ছিল মহিষের কাঁচা দুধের দধি।
ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘কবি যত জায়গায় গিয়েছেন, যত বাড়িতে গিয়েছেন, যে পথে আসা-যাওয়া করেছেন, তার মধ্যে কিছু অংশ হয়তো সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু কবির ‘চরণচিহ্ন’ ইতিহাসে ধরে রাখতে একটি স্মৃতিফলক করা উচিত। এজন্য স্থানীয়ভাবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
