পশ্চিমবঙ্গে বাদপড়া ভোটারদের আপিল
মুসলমান হলে আবেদনই খারিজ
বাদপড়াদের ৮০ শতাংশ মুসলিম * ট্রাইব্যুনাল দূরে হওয়ায় ভোগান্তি
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে লাখ লাখ মানুষ যখন আপিলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়, তখন মুসলিম ভোটারদের আবেদনই সবচেয়ে বেশি খারিজ হচ্ছে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে খারিজ হওয়া ৬ হাজার ৪৪৪টি ভোটারের আপিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদের মধ্যে ৮০ দশমিক ২ শতাংশ ভোটারের নাম মুসলিম সম্প্রদায়ের। কয়েকটি আসনে এ হার ৯০ শতাংশেরও বেশি।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। বুধবারের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ এপ্রিল থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ৬ হাজার ৪৪৪ জন ভোটারের আপিল খারিজ করে দেন আপিল ট্রাইব্যুনালগুলো।
পশ্চিমবঙ্গের গবেষক, বিশ্লেষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী ‘সিভিক রিসার্চ গ্রুপ’ এ প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য দ্য ওয়্যার-এর কাছে তুলে ধরে। নামের ভিত্তিতে করা একটি প্রাক্কলন অনুযায়ী, যাদের আবেদন খারিজ হয়েছে তাদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজন-অর্থাৎ ৮০ দশমিক ২ শতাংশ মুসলিম নামধারী। যে ১২৯টি নির্বাচনি এলাকায় এ খারিজের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে সংখ্যালঘু ভোটাররা মোট ভোটার তালিকার প্রায় ২২ শতাংশ।
হুগলি জেলায়, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটাররা মোট ভোটারের ১৫ শতাংশ, সেখানে খারিজ হওয়া আবেদনগুলোর মধ্যে ৮৩ শতাংশই মুসলিম নামধারী ব্যক্তিদের। কেবল খানাকুল এলাকাতেই ৮৩১টি আপিল খারিজ হয়েছে, যার মধ্যে ৯৬ দশমিক ৫ শতাংশই মুসলিম নামধারী ভোটারদের।
তবে এ খারিজের ঘটনা পুরো পরিস্থিতির কেবল একটি অংশ মাত্র। ট্রাইব্যুনালগুলোতে দুই ধরনের আপিল শুনানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ২২ লাখ আপিল এসেছিল সেইসব ভোটারদের কাছ থেকে, যাদের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং যারা পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, প্রায় ১৬ লাখ আপিল দায়ের করেছিল নির্বাচন কমিশন-এমন ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য, যাদের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা বৈধ বলে গণ্য করেছিলেন।
রাজ্যজুড়ে মোট ৩৮ দশমিক ১ লাখ আপিল দায়ের করা হলেও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এর মধ্যে মাত্র ১ লাখেরও কিছু বেশি আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনকে পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মালদা জেলায়, যেখানে ৬ দশমিক ৮৫ লাখ আপিল দায়ের করা হয়েছিল, সেখানে মাত্র ০ দশমিক ১৫ শতাংশ আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে। যারা আপিল করেছেন, তাদের বেশির ভাগের কাছেই মূল প্রশ্নটি জয় বা পরাজয়ের নয়, বরং তাদের কথা আদৌ কেউ শুনেছে কিনা-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এছাড়া, জেলা ভেদে ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যপদ্ধতিতেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। যেমন, পূর্ব বর্ধমান জেলায় যে বেঞ্চটি শুনানি পরিচালনা করেছেন, তারা তাদের কাছে আসা মামলার ৮৫ শতাংশই খারিজ করে দিয়েছেন। উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া ও দক্ষিণ দিনাজপুরের বেঞ্চগুলো কাউকেই প্রত্যাখ্যান করেনি। ৮০ দশমিক ২ শতাংশের পরিসংখ্যানটি সতর্কতার সঙ্গে বোঝা প্রয়োজন।
এটি সেই ব্যক্তিদের কথা বলে, যাদের অন্তর্ভুক্তির আবেদন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা ‘অযোগ্য’ বলে গণ্য হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা খারিজ হয়ে গেছে। এটি নির্বাচন কমিশনের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য জমা পড়া ১৬ লাখ আবেদনের পরিসংখ্যান নয়। আবেদনকারীদের প্রত্যেকের ধর্মীয় পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য না থাকায়, এ উপাত্ত থেকে এটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে ট্রাইব্যুনালগুলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করেছে কিনা।
এসআইআরের সময় পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের তথ্য ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র কারণে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছিল। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা এদের মধ্যে ২৭ দশমিক ১৬ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেন। সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনায় গঠিত আপিল ট্রাইব্যুনালগুলোতে এ ভোটাররা তাদের নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।
মোট ১৯টি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, যার প্রতিটির নেতৃত্বে আছেন হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। প্রতিটি জেলার আপিল নির্দিষ্ট একটি বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয়। ১৯টি ট্রাইব্যুনালই কলকাতায় অবস্থিত হওয়ায়, মালদা বা কোচবিহারের মতো দূরবর্তী জেলাগুলোর ভোটারদের শুনানির জন্য শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা আরও জানান, আপিলের মাধ্যমে যাদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তাদের নাম কেবল ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোর জন্যই তালিকায় যুক্ত করা হবে।
যাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে : যাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, এমন ৬ হাজার ৪৪৪ জন ভোটারের মধ্যে ৫ হাজার ১৬৯ জনের নাম মুসলিম এবং ১ হাজার ২২১ জনের নাম হিন্দু। ৫৪ জনের নাম কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ফেলা সম্ভব হয়নি। একের পর এক জেলায় দেখা গেছে, স্থানীয় ভোটার তালিকায় মুসলিমদের যে অনুপাত, তার তুলনায় প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিম নামধারীদের সংখ্যা অনেক বেশি।
নির্বাচনি এলাকার (আসন) পর্যায়ে এ প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট। মোট প্রত্যাখ্যানের ৪৪ শতাংশই ঘটেছে পাঁচটি নির্বাচনি এলাকায়। খানাকুলে (৮৩১টি প্রত্যাখ্যান) ৯৬ দশমিক ৫ শতাংশ নামই মুসলিম। অথচ সেখানে সংখ্যালঘু ভোটাররা মোট ভোটারের প্রায় ২০ শতাংশ। বোলপুরে (৮০৮টি প্রত্যাখ্যান) এ হার ৮৮ শতাংশ, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটারদের হার ৩০ শতাংশ। রায়গঞ্জে (৬৫৯টি প্রত্যাখ্যান) এ হার ৯২ শতাংশ। সেখানে সংখ্যালঘু ভোটাররা মোট ভোটারের ১৯ শতাংশ। সবংয়ে (২৩৪টি প্রত্যাখ্যান) এ হার ৮৮ শতাংশ, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ৭ শতাংশেরও কম। যেসব নির্বাচনি এলাকায় অন্তত ২০টি করে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এমন ৫১টি আসনের মধ্যে ৩২টিতেই প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের নামের ৮০ শতাংশ বা তার বেশি ছিল মুসলিম নাম।
ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ও নারীদের প্রসঙ্গ : দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে মোট ২১৫টি আবেদনের ক্ষেত্রে নাম খারিজ হয়েছে, যার ৯৮ শতাংশই হিন্দু নাম এবং প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমন পদবি রয়েছে যা সাধারণত ‘তফসিলি জাতি’ভুক্ত বলে গণ্য হয়। বালুরঘাটে (৬৩টি খারিজ) একজনও মুসলিম আবেদনকারী ছিলেন না। গঙ্গারামপুর (৫৭), তপন (৩৯) এবং কুশমণ্ডি (২৫) এলাকায় খারিজ হওয়া আবেদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল হিন্দুদের। অন্য কয়েকটি নির্বাচনি এলাকাতেও হিন্দুদের সংখ্যাধিক্য দেখা যায়; যেমন-কোচবিহার উত্তর (৩৫টির মধ্যে ৭৪ শতাংশ), উত্তরপাড়া (৫৯টির মধ্যে ৭৬ শতাংশ), খড়গপুর সদর (৩১টির মধ্যে ৭৪ শতাংশ) এবং চুঁচুড়া (৮৫টির মধ্যে ৬২ শতাংশ)।
