যেন হাজারো লাল-বুক টিয়ার বাড়ি
খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কার্যালয়ে এক দশকের বেশি এদের বসবাস
Advertisement
সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
খাগড়াছড়ি শহরের বুকে দেখা মিলছে শত শত লাল-বুক টিয়ার। সম্প্রতি তোলা ছবি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই যেন অন্যরকম এক পরিবেশ তৈরি হয় খাগড়াছড়ির বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কার্যালয় এলাকায়। গাছের সবুজ ডালে শুরু হয় রক্তলাল বুক আর হলুদ ডানার টিয়া পাখিদের দলবেঁধে ওড়াউড়ি ও কিচিরমিচির শব্দ। লাল-বুক টিয়া বা মদনা টিয়া নামের এই পাখিগুলোর কলকাকলির এমন মুখর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন পর্যটকরা। খুব ভোরেও এ দৃশ্যের দেখা মেলে।
বন কর্মীদের পাহারা ও ভালোবাসায় খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কার্যালয় এলাকা গড়ে উঠেছে হাজারো লাল-বুক টিয়ার নিরাপদ রাজ্যে। শিকারিদের আনাগোনা না থাকায় এক দশকেরও বেশি এ এলাকা পাখিগুলোর স্থায়ী আবাসে পরিণত হয়েছে। পাখিগুলোর মিষ্টি সুরে মুখরিত হয়ে থাকে পুরো এলাকা। এমন চমৎকার দৃশ্য যেন পাহাড়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
স্থানীয়রা জানান, এক দশকের বেশি এখানে আবাস গড়ে তুলেছে লাল-বুক টিয়াগুলো। মূলত নিরাপদ পরিবেশ এবং শিকারিদের উৎপাত না থাকায় বছরের পর বছর তারা এ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে বন বিভাগের কর্মীরাও নিয়মিত পাহারা দেন।
খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কার্যালয়ের বনকর্মী মো. নুরউদ্দিন হোসেন বলেন, প্রতিদিন রেঞ্জ ক্যাম্পাসে সন্ধ্যায় প্রচুর টিয়া পাখি আসে। এখানে রাতে টিয়া পাখিগুলো অবস্থান করে, সারা রাত থাকে এবং ভোরে ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে পাখিগুলো চলে যায়। এখানে প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসেন, এসে পাখিগুলোর অবস্থান দেখেন। পাখিগুলোর শব্দে কলকাকলিতে আমাদের অফিস প্রাঙ্গণটা খুব প্রাণবন্ত থাকে।
আরেক বনকর্মী মো. সালাউদ্দিন খান বলেন, আমরা কঠোরভাবে নজরদারি চালাই, যাতে কেউ পাখিগুলোকে ডিস্টার্ব করতে না পারে বা গুলতি মারতে না পারে। কারণ, পাখিগুলো এই অঞ্চলে অনেক পাহাড় ও বনজঙ্গল থাকা সত্ত্বেও আমাদের অফিস প্রাঙ্গণে এসে থাকে। পাখিগুলো এখানে নিরাপদ মনে করে। তাই আমরা পাহারা দিই যেন কোনো শিকারি প্রবেশ করতে না পারে। পাখিগুলো সন্ধ্যায় এখানে এসে বিশ্রাম নেয় এবং ভোরে খাবারের খোঁজে চলে যায়।
খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বেশ কয়েক বছর ধরে কাজ করছে বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি নামে একটি সংগঠন। এর সংগঠক সাথোয়াই মারমা বলেন, পাখি প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লোকালয়ে শিকারি পাখির উপস্থিতি কম থাকায় লাল বুক টিয়াগুলো মানুষের পাশাপাশি নিরাপদে বসবাস করতে পারছে। এসব পাখির আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি তাদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে বট, পাকুড়, উদাল, জাম, ডুমুরসহ বিভিন্ন ফলদ ও দেশীয় প্রজাতির বড় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, এটা খুব আশাজাগানিয়া বিষয়। যেখানে পাহাড় থেকে টিয়া পাখি হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে একসঙ্গে এত টিয়ার আবাস সত্যিই মুগ্ধকর। এখানে হাজার হাজার পাখি আবাসস্থল গড়ে তুলেছে।
এদিকে লাল-বুক টিয়া বা মদনা টিয়ার সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারার পাশাপাশি নতুন করে পাখির খাদ্য উপযোগী গাছ লাগিয়ে বন সৃজনের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এখানে অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। অনেক ধরনের পাখি আমাদের এই ক্যাম্পাসে আছে। তারা এখানে বসবাস করার একটাই কারণ, যদিও ছোট্ট জায়গা এখানে কিন্তু কেউ তাদের বিরক্ত করতে পারে না। তাদের এখানে বসবাসের জন্য যে পরিবেশ দরকার, যে খাদ্য দরকার, তার জন্য আমরা এখানে তাদের খাদ্য উপযোগী গাছ রোপণ করেছি। কেউ যেন এখানে এদের শিকার না করতে পারে সেজন্য সার্বক্ষণিক আমাদের স্টাফরা পাহারা দিয়ে থাকেন। এজন্য পাখিগুলো আমাদের ক্যাম্পাসে সব সময় নিরাপদে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করে।
তিনি জানান, লাল বুক টিয়া বা মদনা টিয়া ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত প্রজাতির পাখি। কেউ শিকার করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।
